ঐতিহ্যবাহী উত্তর বরিশালের সাবেক বনেদী ও সমৃদ্ধ উপজেলা হিজলাকে নদী ভাঙ্গন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অসাধু নেতৃত্বের কালো কবল থেকে রক্ষার দাবিতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (২৫ নভেম্বর) সকাল ১১টায় বরিশাল নগরীর হোটেল কিংফিশারে হিজলা উপজেলা নাগরিক কমিটির আয়োজনে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের পক্ষ থেকে এ্যাডভোকেট প্রফেসর মাহবুবুল আলম দুলাল।
তিনি বলেন, হিজলা ছিল উত্তর বাংলার সম্ভ্রান্ত বনেদী ও ঐতিহ্যবাহী জনপদ। কিন্তু সৎ, সক্ষম ও জনবান্ধব নেতৃত্বের অভাবে এটি আজ নদী ভাঙ্গন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক স্বার্থে প্রশাসনিক বিচ্ছিন্নতা ও উন্নয়ন বঞ্চনার শিকার। ১৯৯১ সাল থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ব্যর্থতা ও কুটিল রাজনৈতিক স্বার্থে ইউনিয়ন ও মৌজা কাটাছেঁড়া করে অন্য জেলায় যুক্ত করা হয়, যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও জনস্বার্থবিরোধী।
তিনি অভিযোগ করেন, ২০০৪ সালে কুচাইপট্টিসহ ৩ ইউনিয়নের ২২টি মৌজা এবং পরবর্তীতে হাজার হাজার একর ভূমি রাজনৈতিক স্বার্থে অন্য জেলায় দিয়ে দেওয়া হয়। সেই সুবাদে হিজলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চলে আন্তঃজেলা সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যু চক্র আধিপত্য বিস্তার করে। তারা বালু, মাটি, মৎস্য, রেণু পোনা, গবাদিপশু, কৃষিপণ্য লুটপাট করে এবং রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সরকারকে বঞ্চিত করে। স্থানীয় অশুভ নেতৃত্ব ও জেলা সদরভিত্তিক প্রভাবশালী মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় এসব দস্যুতার রাজত্ব চলতে থাকে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, বিগত সরকার আমলে বিনা টেন্ডারে বালু উত্তোলন, অবৈধ বালু মহাল পরিচালনা ও প্রশাসনের অসাধু সহযোগিতায় দেড় ডজন খুনের ঘটনা ঘটে। নদী থেকে অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের কারণে হিজলা সদর, মেহেন্দীগঞ্জ, উলানিয়া, দড়িচর খাজুরিয়া, দক্ষিণ পাড় ও হরিনাথপুরসহ বহু এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে।
তিনি অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক টেন্ডার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আবুল বাসেত নামে এক ঠিকাদারের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি আন্তঃজেলা সিন্ডিকেট কোটি টাকার বখরা লেনদেনের মাধ্যমে বালু মহলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে বিডের শর্ত ভঙ্গ করে বালুমহল এলাকার বাইরে থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও দৈনিক চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করা হয়। এতে পরিবেশ ও নদী ভাঙ্গনের ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে তিনি জানান, চুক্তি ভঙ্গ ও চাঁদাবাজির ঘটনায় কোস্টগার্ড কর্তৃপক্ষ হাতেনাতে অভিযুক্তদের আটক ও প্রায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা আরোপ করে। তবে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সিন্ডিকেট আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
তিনি দাবি করেন, মূল বিডার জাকির শিকদারের ওপর দুই দফা সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে শ্রমিকদের মারাত্মক জখম, শতাধিক রাউন্ড গুলি বর্ষণ ও বালুমহাল দখলের ঘটনা ঘটলেও মামলা গ্রহণে গড়িমসি ও আসামিদের গ্রেপ্তারে প্রশাসনের উদাসীনতা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করেছে।
প্রফেসর মাহবুবুল আলম দুলাল বলেন, “হিজলা আজ এতিম জনপদ। নদী ভাঙ্গন, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতিতে এখানে নৈরাজ্য বিরাজ করছে। নিরীহ কৃষক, চাষী, দিনমজুরদের সর্বস্ব লুটে নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনিক ব্যর্থতায় জনগণ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।”
তিনি ডিআইজি বরিশাল রেঞ্জের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয় উল্লেখ করে জানান, উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও অতিরিক্ত ফোর্স সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে অবিলম্বে, ন্ত্রাসী চক্রের গ্রেপ্তার, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, ভূমিদস্যুতা প্রতিরোধ, নদী ভাঙ্গন রোধে জরুরি ব্যবস্থা ও হিজলার প্রশাসনিক মর্যাদা ও উন্নয়ন নিশ্চিতক রার জোর দাবি জানান।
তিনি বলেন, “হিজলাবাসীকে এই ভয়াবহ নৈরাজ্য ও ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় হিজলা মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।”
সংবাদ সম্মেলনে হিজলা উপজেলা নাগরিক কমিটির নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় সচেতন মহল উপস্থিত ছিলেন।