সৈয়দ নুর আহসান, গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি:
দেশব্যাপী আলোচিত বরিশালের গৌরনদী উপজেলার হরিসেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘মিড-ডে মিলের রুটির মধ্যে ব্লেড’ পাওয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপজেলা প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুটি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি কিংবা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্লেড প্রবেশের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং তদন্তে উঠে এসেছে, বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী নিজেই ব্লেডটি রুটির মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল।
এ ঘটনায় তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই না করে রুটির ছবি বিভিন্ন ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা শারমিন জাহানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
বুধবার দুপুরে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও গৌরনদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সেকেন্দার শেখ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে ইউএনও ও পৌর প্রশাসক মো. ইব্রাহীম বলেন, “ঘটনাটি দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। সরকারের ভাবমূর্তি এবং জনগণের আস্থা রক্ষার স্বার্থে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা ছিল আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে আমরা ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করেছি।”
তিনি জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তদন্ত দল প্রথমে রুটি সরবরাহকারী কারখানা সরেজমিনে পরিদর্শন করে। রুটি তৈরির প্রতিটি ধাপ—মিক্সিং, ডো প্রস্তুত, বেকিং, প্যাকেজিংসহ সম্পূর্ণ উৎপাদন প্রক্রিয়া বাস্তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এমনকি বিভিন্ন ধাপে ব্লেড ব্যবহার করে পরীক্ষা চালিয়েও দেখা হয়। তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়, আধুনিক স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি অক্ষত ব্লেড রুটির ভেতরে চলে আসা প্রযুক্তিগতভাবে প্রায় অসম্ভব।
পরবর্তীতে তদন্তের পরিধি বিদ্যালয়কেন্দ্রিক করা হয়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর পারিবারিক পরিবেশও খতিয়ে দেখা হয়। এমনকি তার বাড়িতে ব্যবহৃত ব্লেডের ধরনও যাচাই করে সংশ্লিষ্ট ব্লেড উদ্ধার করা হয়।
ইউএনও জানান, একপর্যায়ে প্রথম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী স্বীকার করে যে, ব্লেডটি তার নিজের ব্যাগে ছিল। বিদ্যালয়ে ব্লেড আনা নিষিদ্ধ হওয়ায় ব্যাগ থেকে বের করার পর সে ভয় পেয়ে যায়। শিক্ষক দেখে ফেললে বকাঝকা বা শাস্তি পেতে পারে—এমন আশঙ্কায় সে ব্লেডটি রুটির মধ্যে লুকিয়ে রাখে। পরে রুটির প্যাকেট খোলার সময় জান্নাত নামে আরেক শিক্ষার্থী ব্লেডটি দেখতে পেলে বিষয়টি শিক্ষককে জানিয়ে দিতে পারে—এই ভয়ে সে নিজেই আগে শ্রেণি শিক্ষকের কাছে গিয়ে দাবি করে, “রুটির মধ্যে ব্লেড পেয়েছি।”
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, অভিযোগ পাওয়ার পর শ্রেণি শিক্ষিকা শারমিন জাহান বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই না করেই ব্লেডসহ রুটির ছবি তুলে শিক্ষকদের ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে পাঠিয়ে দেন। পরে সেই ছবি সদর ক্লাস্টার গ্রুপসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে কোনো তদন্ত বা সত্যতা যাচাইয়ের আগেই ঘটনাটি দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয় এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে।
ইউএনও মো. ইব্রাহীম বলেন, “তদন্ত কমিটি মাত্র তিন দিনের মধ্যেই সব তথ্য-উপাত্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। আমাদের বিশ্বাস, প্রতিবেদনটি শতভাগ তথ্যনির্ভর ও নির্ভুল।”
এর আগে রুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আইল্যান্ড ট্রেডিং করপোরেশনের প্রকল্প পরিচালক শাহ আলম খানও দাবি করেছিলেন, কোকাকোলা ম্যানুফ্যাকচারিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে রুটি উৎপাদন করে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোনো ধাতব বস্তু প্রবেশ করলে তা মিক্সিং পর্যায়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার কথা। ফলে একটি আস্ত ব্লেড রুটির ভেতরে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল বলেন, “সরকারি কর্মচারী হিসেবে কোনো তথ্য যাচাই না করে তা প্রচার করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়। বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।” তবে এ বিষয়ে শিক্ষিকা শারমিন জাহানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, গত ২২ জুলাই গৌরনদী পৌরসভার হরিসেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী টিফিনের সময় রুটি ছিঁড়ে তার মধ্যে ব্লেড দেখতে পাওয়ার দাবি করলে বিষয়টি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করলে উপজেলা প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে। সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনাটির ভিন্ন চিত্র উঠে আসায় বহুল আলোচিত এই ঘটনার নতুন মোড় সৃষ্টি হয়েছে।