বরিশাল শহর আজ আবারও এক নৃশংস অপরাধের সাক্ষী। জেলা পরিষদ মার্কেটের ৩য় তলায় অবস্থিত একটি অনলাইন পত্রিকা অফিস—যা সাংবাদিকতা নয় বরং নানান অপকর্মের আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত ছিল—সেই অফিসেই নির্মমভাবে প্রাণ হারাল চার সন্তানের জনক যুবক বেল্লাল হোসেন রাজ (৩৪)। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে ভয়াবহ সব অভিযোগ, যা বরিশালের সমাজ ও সাংবাদিকতার পরিবেশকে নতুন করে নাড়া দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র সব বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ঘটনা যেভাবে শুরু, বুধবার রাতে বেল্লালকে ফোন করে ডেকে নেওয়া হয় ওই অনলাইন পত্রিকা অফিসে। পরিবার বলছে, ওকে পরিকল্পিতভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর হাসপাতাল থেকে আমরা তার লাশ পাই। এটি স্পষ্ট হত্যা।” — শাহনাজ বেগম, নিহতের স্ত্রী
অন্যদিকে পুলিশ বলছে, চারজন সেখানে ছিল—যাদের মধ্যে মায়া চৌধুরী, সাদিয়া আক্তার এবং রানা হাওলাদারকে আটক করা হয়েছে।
কিন্তু মূল আসামি—নিজেকে সাংবাদিক পরিচয়দানকারী রিপন রানা ওরফে ট্রলার রিপন—এখনও পলাতক।
গ্রেফতারকৃতদের বক্তব্য, আটক রানা হাওলাদার দাবি করেছে, এটা হত্যাকাণ্ড নয়, দুর্ঘটনা। বেল্লাল অসাবধানতাবশত উচ্চ ভোল্টেজ তারে শর্ট খেয়ে পড়ে যায়।
দুটি তরুণী নিজেদের নির্দোষ দাবি করলেও তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে—তারা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন “হানিট্রাপ” ধরনের কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হতো, এবং অপরাধচক্রের নির্দেশে ব্যক্তিদের ডেকে আনা বা প্রলোভন দেখানোর কাজে জড়িত ছিল।
পুলিশের বক্তব্য মধ্যে কোতোয়ালি মডেল থানার তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহতের দেহে পোড়ার দাগ, ঝলসে যাওয়া হাত এবং ক্ষতচিহ্ন দেখে এটি দুর্ঘটনা হিসেবে ন্যায্য মনে হয় না। প্রাথমিকভাবে হত্যারই আলামত পাওয়া গেছে। মূল আসামি রিপন রানাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।”
স্থানীয়দের অভিযোগে অনিবন্ধিত পত্রিকার আড়ালে অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা বহুদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিলেন। তারা আরো বলেন এখানে মাদক কারবার হতো, নারী সরবরাহ, “হানিট্রাপ” ও ব্ল্যাকমেইলিং চালানো হতো অপসাংবাদিকতার পরিচয়ে চাঁদাবাজি, ভয় দেখানো, গোপন ভিডিও করে ভয় দেখানো ছিল নিয়মিত।
পুলিশকে জানানো হলেও “প্রভাবশালী মহলের সম্পর্কের কারণে” ব্যবস্থা হয়নি।
তারা আরও বলেন, এ অফিসে সাংবাদিকতার নামে কিছুই হতো না। এটা ছিল অপরাধীদের নিরাপদ ঘাঁটি। এখন হত্যাকাণ্ডের পর সাইনবোর্ড খুলে ফেলা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এটি পরিকল্পিত হত্যা। বেল্লাল কোনোভাবেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যেতে পারে না। যাদের ডাকে সে সেখানে গিয়েছিল, তারাই তাকে হত্যা করেছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সমাজবিজ্ঞানী বলেন, সামাজিক অবক্ষয়, বেকারত্ব, অপরাধী চক্রের বিস্তার এবং অনলাইন সাংবাদিকতার নিয়ন্ত্রণহীনতা মিলিয়ে একটি বড় অপরাধজগৎ গড়ে উঠছে। এই ঘটনা সেটির স্পষ্ট উদাহরণ।”
একজন আইনজীবী মন্তব্য করেন, এজাহারভুক্ত মূল আসামিকে গ্রেফতার ছাড়া এই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত অসম্ভব। পুলিশকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপমুক্তভাবে কাজ করতে দিতে হবে।”
বরিশালবাসী ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্থানীয়দের তীব্র ক্ষোভ দেখা গেছে।
অনেকে মন্তব্য করেছেন, একটি পত্রিকা অফিসে এমন অপরাধ বরিশালের জন্য কলঙ্ক। অনলাইন নিউজের নামে অপরাধচক্র যত দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না হবে, এমন ঘটনা বাড়তেই থাকবে। বেল্লালের মতো সাধারণ মানুষ নিরাপদ নয়–এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ।”
এই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়। এটি বরিশালের একটি গভীর সামাজিক সমস্যার প্রতিচ্ছবি— যেমন অপসাংবাদিকতা, নারী ও মাদক সরবরাহ চক্র, হানিট্রাপ–ব্ল্যাকমেইলিং, অপরাধীদের সুরক্ষা।
এই ঘটনাটি বরিশালের তরুণ সমাজের নিরাপত্তা, অনলাইন মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ, এবং অপরাধ প্রতিরোধ ব্যবস্থার উপর বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
বরিশালের এই হত্যা শুধু একটি ‘ক্রাইম নিউজ’ নয়—এটি নগরীর সামাজিক সংকটের প্রতিফলন। অপরাধীদের গ্রেফতার এবং এই অন্ধকার চক্র ভেঙে দেওয়া না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় ট্র্যাজেডির সম্ভাবনা থাকছে। আজ প্রয়োজন, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা, শুদ্ধ সাংবাদিকতা এবং অপরাধের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান।