নিজস্ব প্রতিবেদক:
পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার লেবুখালী পায়রা সেতুর নিচে পুরাতন ফেরিঘাট এলাকায় আয়োজিত ঈদ আনন্দ মেলার নামে প্রকাশ্যে অবৈধ লটারি বাণিজ্য পরিচালনা করার অভিযোগ উঠেছে। গত (১৯ মার্চ) বৃহস্পতিবার মেলা শুরুর পর থেকেই এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও ঈদুল ফিতরের পরদিন (২২ মার্চ) রবিবার থেকে লটারির কার্যক্রম প্রকাশ্য ও বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সূত্রে জানা গেছে, গত (১৯ মার্চ ) বৃহস্পতিবার মেলার উদ্বোধন করা হয়। স্থানীয় একটি সাংবাদিক সংগঠনের আয়োজনে পরিচালিত এ মেলায় বিনোদনের পাশাপাশি নানা ধরনের দোকানপাট, খেলাধুলা ও আকর্ষণীয় আয়োজন রাখা হলেও এখন মেলার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে লটারির বেচাকেনা। মেলার ভেতরে মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, টেলিভিশন, ফ্রিজ, ফ্যানসহ নানা পণ্য পুরস্কার হিসেবে প্রদর্শন করে সাধারণ মানুষকে টিকিট কিনতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। শুধু মেলার মাঠেই নয়, দুমকি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা, বাজার, গ্রাম, পাড়া-মহল্লা এবং আশপাশের অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে এ টিকিট বিক্রির কার্যক্রম। স্থানীয়দের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু বিক্রয়কর্মী প্রতিদিন এলাকাভিত্তিকভাবে টিকিট বিক্রি করছেন এবং সহজেই মানুষকে আকৃষ্ট করতে মাইকিং, মুখে মুখে প্রচার ও প্রলোভনমূলক কথাবার্তা ব্যবহার করছেন। এতে নিম্নআয়ের মানুষ, দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক, কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মেলার একপাশে লটারির ড্রয়ের জন্য আলাদা মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। সেখানে মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন পুরস্কার সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। মঞ্চের সামনে টেবিল-চেয়ার পেতে কয়েকজন বিক্রেতা প্রকাশ্যে টিকিট বিক্রি করছেন। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত সেখানে ভিড় বাড়তে থাকে। নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশু ও কিশোরদেরও লটারির স্টলের আশপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের আয়োজন একদিকে যেমন জুয়ামুখী মানসিকতাকে উৎসাহিত করছে, অন্যদিকে সামাজিকভাবে কিশোরদের বিপথে নেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করছে।
এদিকে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, মেলার নামে চালানো এ লটারি বাণিজ্য মূলত দ্রুত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার একটি কৌশল। প্রতিদিন শত শত টিকিট বিক্রি হলেও পুরস্কার পাওয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। কে পুরস্কার পাচ্ছে, কীভাবে ড্র হচ্ছে, আদৌ সব পুরস্কার বিতরণ করা হচ্ছে কি না-এসব বিষয়ে স্পষ্ট কোনো জবাব পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ বলছেন, সাধারণ মানুষকে পুরস্কারের আশায় টিকিট কিনতে উৎসাহিত করা হলেও বাস্তবে অধিকাংশ ক্রেতাই বারবার হতাশ হচ্ছেন।
মেলায় আসা দর্শনার্থী জহিরুল ইসলাম বলেন, “আমি প্রতিদিন ৬/৭টা করে লটারি কিনি, কিন্তু কিছুই পাই না। লটারি বিক্রেতারা লোভনীয় পুরস্কারের কথা বলে মানুষকে টানছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই ঠকছে।
নির্মাণ শ্রমিক আসিফ শেখ বলেন, “লটারির নেশায় প্রতিদিন যা আয় করি, তার অনেকটাই টিকিট কিনে শেষ হয়ে যায়। প্রতিদিনই ভাবি এবার হয়তো কিছু একটা পাব, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই মেলে না।”
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মেলার আয়োজকরা প্রশাসনের একটি মহল এবং কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিকে ম্যানেজ করেই এ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। তাদের ভাষ্য, প্রকাশ্যে এত বড় পরিসরে লটারির টিকিট বিক্রি, পুরস্কার প্রদর্শন এবং লোকসমাগমের পরও সংশ্লিষ্টদের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, মেলার নামে এ ধরনের অবৈধ লটারি বাণিজ্য জনসাধারণের অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতারও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ দ্রুত লাভের আশায় টিকিট কিনে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এতে পরিবারে অর্থসংকট, হতাশা এবং অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিপূর্ণ মানসিকতা বাড়ছে। অনেকে মনে করছেন, এ ধরনের কার্যক্রম দীর্ঘদিন চলতে থাকলে এলাকায় জুয়ামুখী প্রবণতা আরও বাড়বে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেলা পরিচালনার জন্য শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দেওয়া হলেও সেই অনুমতির আড়ালে লটারির মতো বিতর্কিত ও বেআইনি কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অনুমতির শর্ত ভঙ্গ করে ভিন্নধর্মী কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে তা আইনগতভাবে দেখার সুযোগ রয়েছে।
দুমকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. ফরিদা সুলতানা বলেন, “শর্তসাপেক্ষে মেলা পরিচালনার জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শর্ত ভঙ্গ করে আইন অমান্য করার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের কিছু হয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ স্থাপন সম্ভব হয়নি।
বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মাহাফুজুর রহমান বলেন, “পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।