পদ্মা সেতু চালুর পর নৌপথে যাত্রী সংকট যেন চরমে পৌঁছেছে। যে সংকটে তিন বছর আগে ঢাকা–বরিশাল রুটে বন্ধ হয়ে যায় রাষ্ট্রীয় স্টিমার সার্ভিস- সেই সার্ভিস ফিরিয়ে আনার বহুল প্রত্যাশিত উদ্যোগও প্রথম দিনেই হোঁচট খেলো।
দুই শতকের ইতিহাস বুকে নিয়ে নবজাগরণের স্বপ্নে সেজে উঠেছিল প্যাডেল স্টিমার ‘পিএস মাহসুদ’। শুক্রবার ছিল তার নতুন যাত্রার নির্ধারিত দিন, কিন্তু একজন যাত্রীও না মেলায় বাতিল করতে হলো উদ্বোধনী ভ্রমণ।
বিআইডব্লিউটিসির দীর্ঘ প্রস্তুতি, প্রচারণা ও স্টিমার সংস্কারে ব্যয়ের পরও যাত্রার এমন দুঃখজনক সূচনা পুরো নৌখাতে এক ধরনের শূন্যতার সুর তুলে দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন নতুন করে জানাল, শৌখিন পর্যটকদের লক্ষ্য করেই স্টিমারটিকে সাজানো হলেও ভাড়া সংক্রান্ত সংশয়েই যাত্রীরা ইতস্তত বোধ করছেন।
যদিও ভাড়ার ঘোষণা এখনও আনুষ্ঠানিক হয়নি, তবু অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, ঢাকা–বরিশাল রুটে এসি কেবিন ভাড়া হতে পারে ৬ হাজার টাকা, নন-এসি ৪ হাজার এবং সাধারণ চেয়ারের ভাড়া ২ হাজার ৬০০ টাকা।
অন্যদিকে বেসরকারি লঞ্চে যেখানে প্রথম শ্রেণি ১ থেকে ২ হাজার, সেখানে স্টিমারের এই ভাড়া সাধারণ যাত্রীর নাগালের বাইরে চলে যাবে, এমনটাই ধারনা সংশ্লিষ্টদের।
বিআইডব্লিউটিসির মহাব্যবস্থাপক (যাত্রী ও প্রশাসন) গোপাল চন্দ্র মজুমদার অবশ্য দাবি করেছেন, ভাড়া এখনও নির্ধারিত হয়নি। তাঁর ভাষায়, “ভাড়া নির্ধারণের কাজ মন্ত্রণালয়ের কমিটির। আমরা কোনো ভাড়া চূড়ান্ত করিনি।” তিনি আরও জানান, উদ্বোধনী যাত্রার আগ পর্যন্ত পাঁচ-ছয়জন বুকিং নিলেও তারা পরে তা বাতিল করেন।
স্টিমার ‘মাহসুদ’ প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী এক জলযান। ১৯২৮ সালে যাত্রী পরিবহনে নামা এই স্টিমার বহু বছর বিকল পড়ে ছিল। দেশের নৌইতিহাসের স্মারক হয়ে থাকা এই জাহাজটিকে ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। নৌপরিবহন উপদেষ্টা ও বরিশালের সন্তান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের আগ্রহেই আবারও জাগিয়ে তোলা হয় হারানো এই ঐতিহ্য।
গত ২৪ অক্টোবর পরীক্ষামূলক চলাচলের পর ১৫ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় ‘মাহসুদ’। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, প্রতি শুক্রবার সকাল ৮টায় ঢাকা থেকে বরিশাল যাবে, পরদিন একই সময়ে ফিরবে। সপ্তাহের অন্য দিন ঢাকার আশপাশে প্রমোদভ্রমণে ব্যবহার করা হবে।
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে স্টিমার ছিল একসময়ের আভিজাত্য, সংস্কৃতি ও যাত্রার রোমান্স। ১০–১২ ঘণ্টার সেই পথ ছিল গল্পে, গানে আর নদীর স্রোতে ভরা এক অন্যরকম যাত্রা।
কিন্তু সড়ক যোগাযোগের উন্নতি আর সময়ের দাবি, সব মিলিয়ে সেই স্বর্ণযুগ হারিয়ে গেছে অনেক আগেই।
সরকারি স্টিমার সার্ভিস বন্ধ হওয়ার পর বহু অপেক্ষার পর যে সেবাটি আবার ফিরল, প্রথম দিনেই যাত্রীশূন্যতার এই হতাশা নতুন প্রশ্ন তুলছে, ঐতিহ্য কি ফিরতে পারবে বাণিজ্যিক ভাড়ার ভার সামলে? নাকি নদী-নির্ভর সেই সোনালি স্মৃতিই ক্রমে পরিণত হবে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ে?