বরিশাল সদর উপজেলার কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির একটি সরকারি অনুষ্ঠানে নির্ধারিত সময়ের প্রায় পৌনে ৬ ঘণ্টা বিলম্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরওয়ার। এতে সকাল থেকে অপেক্ষমাণ শত শত কৃষকের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে গিয়ে অনেক কৃষক অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত একাধিক সরকারি কর্মকর্তাও এ পরিস্থিতিতে বিব্রত ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বরিশাল সদর উপজেলা পরিষদের হলরুমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের খরিপ-২ মৌসুমে কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে চারা, গ্রীষ্মকালীন শাক-সবজির বীজ ও সার বিতরণের আয়োজন করা হয়।
আয়োজক সূত্রে জানা যায়, সকাল ৯টায় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল ৮টা থেকেই চন্দ্রমোহন, চরমোনাই, জাগুয়া ও টুঙ্গিবাড়িয়া বাদে সদর উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ জন কৃষক হলরুমে উপস্থিত হন। কিন্তু দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দুপুর ২টা ৪৬ মিনিটে অনুষ্ঠানে পৌঁছান প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরওয়ার।
দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কৃষকেরা। চরবাড়িয়া ইউনিয়নের কৃষক বাবুল আকন, সেকান্দার আকন, মো. সুরুজ, সফিকুল ইসলাম ও মো. আরাফাত বলেন, “সকাল ৯টা থেকে আমাদের বসিয়ে রাখা হয়েছে। পাঁচ-ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করিয়ে এমন ভোগান্তিতে ফেলা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি।”
রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়নের কৃষক শাজাহান, মালেক, রিয়াজ ও আতাউল বলেন, “আমরা দিন এনে দিন খাই। মাত্র কয়েকশ টাকার কৃষি উপকরণ নিতে এসে পুরো একটি কর্মদিবস নষ্ট হয়ে গেল। এমপি সাহেব যদি সময়মতো আসতে না পারেন, তাহলে আগে থেকেই জানানো উচিত ছিল। আমাদের মতো সাধারণ কৃষকদের এভাবে ভোগান্তিতে ফেলা উচিত নয়।”
কাশিপুর ইউনিয়নের কৃষক দেলোয়ার বলেন, “বারবার বলা হয়েছে, আর কিছুক্ষণ পরই এমপি সাহেব আসবেন। কিন্তু অপেক্ষা করতে করতে দুপুর গড়িয়ে যায়। অনেক কৃষক বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। সকাল ৯টার অনুষ্ঠান বিকেলে হওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষি কর্মকর্তা জানান, অনুষ্ঠানটি আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। সকাল থেকেই সংসদ সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও বারবার জানানো হয় তিনি আসছেন। এক কর্মকর্তা বলেন, “কৃষকদের ক্ষোভের মুখে আমাদের পড়তে হয়েছে। সরকারি চাকরি করি বলে প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারি না। সবাই কাজ ফেলে এসেছিলেন, কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষায় অনেকে ফিরে গেছেন।”
কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘ বিলম্বের কারণে অনেকেই কৃষিকাজ ও দৈনন্দিন আয়ের সুযোগ হারিয়েছেন। তাদের দাবি, সরকারি প্রণোদনা বিতরণের মতো জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে এমন অব্যবস্থাপনা কাম্য নয়।
স্থানীয়দের মতে, কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচি সরকারের কৃষিবান্ধব উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠান শুরু না হওয়া এবং শত শত কৃষককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হওয়ায় কর্মসূচির ইতিবাচক উদ্দেশ্য অনেকটাই ম্লান হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, মাঠপর্যায়ে এ ধরনের অব্যবস্থাপনা অব্যাহত থাকলে সরকারের জনসেবামূলক উদ্যোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হতে পারে।
সচেতন মহলের অভিমত, একজন জনপ্রতিনিধির সময়ানুবর্তিতা শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতারও প্রতিফলন। সরকারি কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করানো হলে প্রশাসনিক সমন্বয়, সেবার মান এবং জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তারা মনে করেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মসূচিতে নির্ধারিত সময় কঠোরভাবে অনুসরণ করা হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে এবং সরকারি উদ্যোগের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।
এদিকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, এর আগের দিন (২২ জুলাই) বরিশাল জিলা স্কুলে অনুষ্ঠিত প্রথম বার্ষিক মেধা পুরস্কার ও সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানও নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই ঘণ্টা পরে শুরু হয়। তাদের দাবি, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; অধিকাংশ অনুষ্ঠানেই সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরওয়ার নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে উপস্থিত হন। এতে শিক্ষার্থী, কৃষক, আয়োজক এবং সাধারণ মানুষকে নিয়মিত ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
এ বিষয়ে বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. ফরিদা সুলতানার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরওয়ারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর কৃষকদের মধ্যে একটি প্রশ্নই বেশি উচ্চারিত হয়েছে—”সাধারণ মানুষের সময়ের কি কোনো মূল্য নেই?” তাদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে সরকারি কর্মসূচিতে নির্ধারিত সময় মেনে উপস্থিত থেকে জনপ্রতিনিধিরা জনগণের সময়, শ্রম ও জীবিকার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করবেন।