অনুসন্ধানী প্রতিবেদক ;
বরিশালে ২০০৪ সালে র্যাবের কথিত ‘ক্রসফায়ার’ আতঙ্কে আত্মগোপনে যাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী নাক কাটা রুবেল ফের নগরীর ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের রিফিউজি কলোনিতে পুরনো রূপে ফিরে এসেছে। সম্প্রতি প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। ঘটনার একাধিক দিন পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে কিংবা তার বাহিনীর কাউকে আটক করতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
গত ১৭ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ১০টা ৩০ মিনিটে বরিশাল নগরীর রিফিউজি কলোনিতে নাক কাটা রুবেল ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী মোটরসাইকেলে মহড়া দিয়ে মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ করে। হঠাৎ এ ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, মানুষ ঘরবন্দী হয়ে পড়ে।
গ্রেপ্তার না হওয়ায় পুলিশের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে
এলাকাবাসীর অভিযোগ করে বলেন , গুলিবর্ষণের ঘটনার পর কয়েকদিন অতিবাহিত হলেও নাক কাটা রুবেল এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, রুবেলের কাছে এখনো অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে, যা দিয়ে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
রিফিউজি কলোনির বাসিন্দারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দ্রুত রুবেলকে আটক না করা হলে ভবিষ্যতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তার দায়ভার বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশকেই নিতে হবে।
১৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য সচিব মঈন বলেন, নাক কাটা রুবেল ২০০৪ সালের অনেক আগ থেকেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত। সে সময়ের ১৪ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার ও বরিশাল মহানগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল আলম মেহেদীর ডান হাত হিসেবে পরিচিত ছিল সে। চাঁদাবাজি, জমি দখল, মারধর, অপমান-অপদস্ত—এমন কোনো অপরাধ নেই যা তার বাহিনী করেনি। এমনকি নারীদের গায়েও হাত তুলেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০০৪ সালে মাহাবুবুল আলম মেহেদী র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার পর নাক কাটা রুবেল গ্রেপ্তারের ভয়ে বরিশাল ছেড়ে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বরিশাল মহানগর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক রইজ আহাম্মেদ মান্নার সঙ্গে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করতে দেখা যায় নাক কাটা রুবেলকে। ওই সময় ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগ পর্যন্ত কালী বাড়ি রোডের সেরনিয়াবাত ভবনে অবস্থান করছিল সে।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ৭ আগস্ট নাক কাটা রুবেল বিএনপির নাম ভাঙিয়ে ফের রিফিউজি কলোনিতে প্রভাব বিস্তার শুরু করে। মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে এলাকায় আতঙ্কের রাজত্ব কায়েম করে।
রুবেলের এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করেন স্থানীয় যুবক ইমরান হোসেন রকি। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, রকি সাধারণ মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকায় তিনি জনপ্রিয়। কিন্তু এই প্রতিবাদের জের ধরেই ১৭ ডিসেম্বর রাতে নাক কাটা রুবেল তার বাহিনী নিয়ে এসে রিফিউজি কলোনিতে গুলিবর্ষণ করে পালিয়ে যায়।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
রুবেলের বক্তব্য, বিশেষ সূত্রে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নাক কাটা রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, ২০০৪ সালে মেহেদীর সঙ্গে থাকলেও কোনো অপকর্ম করেননি। ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের অভিযোগও ‘ভুল ধারণা’ বলে উড়িয়ে দেন। আত্মসমর্পণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি কেন ধরা দেব?”
এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমি ১৪ মাস ধরে বরিশালে দায়িত্ব পালন করছি। এই প্রথম রিফিউজি কলোনিতে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। নাক কাটা রুবেলকে এর আগেও দুইবার গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছিল, কিন্তু জামিনে বেরিয়ে আসে। বর্তমানে আমাদের টিম মাঠে কাজ করছে। খুব শিগগিরই তাকে আটক করা হবে।
জননিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা নিয়ে এলাকাবাসীর দাবি করে বলেন , দ্রুত নাক কাটা রুবেলকে গ্রেপ্তার করে তার কাছে থাকা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না করলে রিফিউজি কলোনি ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ড আবারও সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে। সামনে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারকে জরুরি বলে মনে করছেন তারা।