বরিশালে গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে হানিট্র্যাপ চক্রের তৎপরতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতারণা ও ভয়ভীতির মাধ্যমে টার্গেট ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইল করা-এটাই এই চক্রের মূল কৌশল। সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কিভাবে কাজ করে চক্রটি স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, চক্রটিতে যুক্ত থাকে, কিছু আবাসিক হোটেলের নারী কর্মী, অপসাংবাদিক পরিচয়ের প্রতারক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসীমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত কিছু যুবক, এবং অনৈতিকভাবে সুবিধা নেওয়া এক শ্রেণির অসাধু পুলিশ সদস্য।
ধান্দাবাজ চক্রটি মূলত অর্থসম্পদশালী ও নারী-লোভী পুরুষদের টার্গেট করে। প্রথমে আবাসিক হোটেলের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী টার্গেট শনাক্ত করে। পরে কৌশলে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে তাদেরকে নির্জন স্থানে নিয়ে যায় এবং ঠিক সেই সময় পরিকল্পিতভাবে চক্রের অন্য সদস্যরা হাজির হয়ে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়।
বরিশাল নগরের ভাটার খাল এলাকার জেলা পরিষদ মার্কেটের অনলাইন পত্রিকা অফিসে একজন যুবকের মৃত্যু—নগরীর সবচেয়ে আলোচিত হানিট্র্যাপ ঘটনার একটি। মৃত্যুর রহস্যজনক পরিস্থিতি তদন্তে বেরিয়ে আসে প্রতারণা ও টার্গেটিংয়ের কৌশল। এ ঘটনার পর থেকেই বরিশালের সাংবাদিক মহলে হানিট্র্যাপ নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
পুলিশ ও ডিবির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, হানিট্র্যাপ চক্রের বিরুদ্ধে এখন বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করতে ডিবি পুলিশ গোপন সোর্সও নিয়োগ করেছে। কয়েকটি গোপন অভিযান ইতোমধ্যে পরিচালনা করা হয়েছে বলেও জানা যায়।
পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা বেশ কিছু শক্ত প্রমাণ পেয়েছি। চক্রটি অত্যন্ত সংগঠিত। কিছু হোটেল-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। খুব শিগগিরই বড় ধরনের অভিযান শুরু হবে।
সাংবাদিক সমাজ জানায়, এ চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ছায়ার আড়ালে কাজ করছে। কয়েকজন সাংবাদিক তথ্য সংগ্রহের সময় সরাসরি চক্রের হুমকির মুখেও পড়েছেন।
এক স্থানীয় অনলাইন সংবাদমাধ্যমের কর্মী জানান, হানিট্র্যাপ চক্রের বিরুদ্ধে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে আমরা কাজ করছি। সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতে এটা খুবই জরুরি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী জানান, হোটেলের এক মেয়ের মাধ্যমে পরিচয় হয়েছিল। পরে তিন-চারজন লোক এসে আমাকে ভয় দেখিয়ে বড় অংকের টাকা দাবি করে। না দিলে মোবাইলে করা ভিডিও পাবলিক করে দেওয়ার হুমকি দেয়।
আরেকজন যুবক বলেন, প্রথমে কিছুই বুঝিনি। পরে ফাঁদে পড়ার পর টের পাই যে একটা দল আগেই সব ঠিক করে রেখেছিল। টাকা না দিলে ছাড়বে না—এমন আচরণ করছিল।
বরিশাল নগরের বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সবাই এ ধরনের চক্র নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।
রূপাতলী এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, এই চক্রগুলো মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে। দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।”
চাঁদমারীর এক অভিভাবক বলেন, হোটেল ব্যবসা এবং পুলিশের মধ্যে যদি অনৈতিক যোগসাজশ থাকে, সেটার বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
কাজিরহাটের একজন দোকানদার বলেন, বরিশালে আগে এমন ঘটনা এভাবে শোনা যেত না। এখন মনে হচ্ছে একটা বড় নেটওয়ার্ক কাজ করছে।
বরিশালের মানুষ এখন আশা করছে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সাংবাদিক সমাজ এবং প্রশাসন সমন্বিতভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেবে, যাতে হানিট্র্যাপ চক্র স্থায়ীভাবে নির্মূল হয়।