রিপোর্ট আসাদুজ্জামান মুরাদ
বরিশাল নগরীর প্রাণকেন্দ্র সদর রোড। প্রতিদিন জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে চিকিৎসার আশায় এখানে ছুটে আসেন অসংখ্য মানুষ। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, অসহায় এসব রোগী ও স্বজনদেরই টার্গেট করে সক্রিয় রয়েছে একটি শক্তিশালী রোগী ধরার দালালচক্র। হাসপাতাল, চিকিৎসকের চেম্বার ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আশপাশে ঘোরাফেরা করে তারা রোগীদের নানা প্রলোভন ও ভুল তথ্য দিয়ে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, দালালনির্ভর কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টার রোগী পাঠানোর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের কমিশন দেয়। ফলে চিকিৎসার প্রকৃত প্রয়োজনের চেয়ে কমিশননির্ভর পরীক্ষা-নিরীক্ষার বোঝা চাপছে রোগীর ওপর। একজন অসহায় মানুষ চিকিৎসার আশায় নগরীতে এসে শেষ পর্যন্ত হাজার হাজার টাকা খরচ করে নিঃস্ব হয়ে বাড়ি ফিরছেন—এ অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু প্রতারণা নয়; এটি মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা একটি নিষ্ঠুর বাণিজ্য।
স্থানীয়ভাবে মাসুম, দেলোয়ার, মিজান, ইমন, সুমন, শাহ আলম, তপনসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে রোগী ধরার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদে আজাহার. রিপন, সুমন এয়ারপোর্ট থানার এস আই মাইনুলের মাধ্যমে ওসি শাখাওয়াতকে মাসিক ২০ হাজার টাকার বিনিময় রোগী ধরা দালালদের লাইসেন্স দিয়ে দিয়েছে। মাসিক এই মাসোয়ারার মাধ্যমে তারা রোগী ধরা দালালদের সেল্টার দিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে ভুঁই ফোর ডায়াগনস্টিক এর মালিক ঝাড়ুদার শাহিনের আদলে মিঠু। এই মিঠুর মাধ্যমে ২০ হাজার টাকায় এয়ারপোর্ট থানার এসআই মাইনুল এর সাথে মাসিক মাসোয়ারার রফ দফা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করে সচেতন সমাজ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রশ্ন হচ্ছে, এত অভিযোগ, এত আলোচনা ও গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়?
আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, একটি প্রথম শ্রেণির জাতীয় দৈনিকের বরিশাল ব্যুরো প্রধান এবং একটি সাংবাদিক সংগঠনের নেতার পরিচয় ব্যবহার করে এক প্রভাবশালী ব্যক্তি কথিত দালালচক্রকে আশ্রয়-প্রশ্রয় ও শেল্টার দিচ্ছেন। এমনকি দালালদের কাছ থেকে কোতোয়ালি থানা, ডিবি ও সিটিএসবির নামে মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
এই অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন শুধু একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে নয়, প্রশ্ন উঠবে পুরো ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে।
তবে অভিযোগ যতই গুরুতর হোক, প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সাংবাদিকতার নীতির পরিপন্থী। তাই প্রয়োজন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত। কে টাকা নিচ্ছে? কার নামে টাকা নেওয়া হচ্ছে? সত্যিই কি কোনো পুলিশ সদস্য বা কর্মকর্তার কাছে সেই অর্থ পৌঁছায়? নাকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ব্যবহার করে কেউ নিজেই অর্থ আদায় করছে? এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা জরুরি।
সদর রোডের রোগী ধরার দালালচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর লাইসেন্স, পরীক্ষা-নিরীক্ষার বৈধতা, চিকিৎসকদের রেফারেল প্রক্রিয়া এবং রোগীপ্রতি কমিশনের অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনা উচিত।
কারণ চিকিৎসা কোনো পণ্য নয়, আর অসুস্থ মানুষ কোনো কমিশনের উৎস হতে পারে না।
বরিশালের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি প্রত্যাশা একটাই, অভিযোগ সত্য হলে দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন, আর অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও পরিষ্কার করুন।
সাংবাদিকতার পরিচয় যদি সত্যিই কোনো অপরাধীচক্রের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত বা খণ্ডন হওয়া দরকার। কারণ একজন সাংবাদিকের পরিচয় মানুষের আস্থা তৈরি করার জন্য, দালালচক্রকে রক্ষা করার জন্য নয়।
সদর রোডকে রোগী বাণিজ্যের অভয়ারণ্য নয়, নিরাপদ চিকিৎসাসেবার নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চায় বরিশাবাসী। এখন দেখার বিষয়, দালালচক্রের বিরুদ্ধে আইন জাগে, নাকি প্রভাবশালীদের ছায়ায় অভিযোগগুলোও ধামাচাপা পড়ে যায়।