মন্তব্য কলাম ; আসাদুজ্জামান মুরাদ
কবি শুধু শুধু বলেন নায়—
“এসেছিলে তুমি, কেঁদেছিলে তুমি, হেসেছে ভুবন;
এমন জীবন করিবে গঠন—
হাসিবে তুমি, কাঁদিবে ভুবন।”
আজ এই উক্তিগুলো যেন বাস্তবতার নিষ্ঠুর সত্যে পরিণত হয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র, বজ্রকণ্ঠের প্রতিবাদী যোদ্ধা শহীদ শরীফ ওসমান হাদী আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশ ও জাতি হারিয়েছে ন্যায়ের পক্ষে অবিচল এক সাহসী কণ্ঠকে। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি হাসতে হাসতে লড়েছেন আর চলে যাওয়ার সময় গোটা ভুবনকে কাঁদিয়ে গেছেন।
জীবন বড়ই অনিশ্চিত। কে কখন চলে যাবে, কেউ জানে না। হাদীর ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। কিন্তু তাঁর এই চলে যাওয়া কেবল ব্যক্তিগত শোকের বিষয় নয়; এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। কারণ তিনি শুধু একজন বক্তা বা সংগঠক ছিলেন না—তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক প্রতীক।
আজ যখন চারদিকে আপস, সুবিধাবাদ ও নীরবতার সংস্কৃতি দানা বেঁধেছে, তখন হাদীর মতো কণ্ঠ ছিল প্রয়োজনীয় বাতিঘর। সেই বাতিঘর হঠাৎ নিভে যাওয়ায় পথ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শরীফ ওসমান হাদীর বজ্রকণ্ঠ জন্ম নেয়নি হঠাৎ করে। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, অবিচার ও মানুষের আর্তনাদ তাঁকে তৈরি করেছে। তিনি কথা বলতেন অভিজ্ঞতা থেকে, ক্ষোভ থেকে, দায়িত্ববোধ থেকে। তাই তাঁর বক্তব্য ছিল সরাসরি, স্পষ্ট ও আপসহীন।
তিনি বিশ্বাস করতেন-সত্য বলার সময় কণ্ঠ নরম হলে চলে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হলে উচ্চারণ হতে হয় দৃঢ়। এই দৃঢ়তাই তাঁকে অনেকের কাছে অস্বস্তিকর করে তুলেছিল, আবার অসংখ্য মানুষের কাছে করে তুলেছিল ভরসার জায়গা।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে হাদী যে ভাষায় কথা বলতেন, তা ছিল ভিন্নধর্মী। সেখানে দলীয় স্লোগানের চেয়ে মানবিক দাবি বেশি গুরুত্ব পেত। তিনি রাজনীতিকে দেখতেন নৈতিকতার জায়গা থেকে। তাঁর কাছে রাজনীতি মানে ছিল মানুষের অধিকার, ন্যায্যতা ও সম্মানের লড়াই।
তিনি জানতেন, এই অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ। তবু তিনি পিছপা হননি। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন-ভয় পেলে অন্যায় আরও শক্তিশালী হয়।
হাদীর মৃত্যু তাঁর কণ্ঠকে থামাতে পারেনি। বরং তাঁর বিদায়ের পর সেই কণ্ঠ আরও জোরালোভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে মানুষের মুখে মুখে। রাজপথে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, আলোচনায় শোনা যাচ্ছে-তুমি কে, আমি কে-হাদী, হাদী।
এই উচ্চারণ প্রমাণ করে, একজন মানুষ শারীরিকভাবে চলে গেলেও তাঁর আদর্শকে মুছে ফেলা যায় না। হাদী এখন আর একজন ব্যক্তি নন; তিনি এক প্রতিরোধের নাম।
শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যুতে দেশ হারিয়েছে এক নির্ভীক কণ্ঠ, জাতি হারিয়েছে এক নৈতিক সাহস। এমন মানুষ খুব বেশি জন্মান না। যাঁরা সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবেন না, তাঁদের সংখ্যা সব সময়ই সীমিত।
এই ক্ষতি অপূরণীয়—কারণ কণ্ঠ অনেক আছে, কিন্তু সাহসী কণ্ঠ খুব কম।
হাদীর মৃত্যু আমাদের সামনে বড় প্রশ্ন রেখে গেছে। আমরা কি তাঁর আদর্শ ধারণ করব, নাকি শোক সেরে আবার নীরবতায় ফিরে যাব? আমরা কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলব, নাকি সুবিধার নিরাপদ আশ্রয় বেছে নেব?
তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে—তাঁর দেখানো পথে হাঁটা। ভয় ভাঙা, আপসের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করা এবং সত্য উচ্চারণে দৃঢ় থাকা।
হাদী, তুমি জেনে রেখো—
তুমি হাসতে হাসতে লড়েছো,
আর তোমার বিদায়ে কেঁদেছে ভুবন।
চলে যেতে হয় সবাইকে, কিন্তু সবাই ইতিহাস রেখে যেতে পারে না। তুমি রেখে গেছো এক অসমাপ্ত সংগ্রাম, যা এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব এখন আমাদের সবার।
শহীদ শরীফ ওসমান হাদী—
তোমার মৃত্যুতে আমরা শোকাহত,
তোমার আদর্শে আমরা ঋণী,
আর তোমার পথেই আমাদের এগোতে হবে।