মন্তব্য প্রতিবেদন ; আসাদুজ্জামান মুরাদ
সারা দেশের মানুষ গত দুই দিন ধরে নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে ছিল একদিকে—রাজশাহীর তানোরের একটি পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের অন্ধকার গহ্বরে। সেখানে আটকে ছিল মাত্র দুই বছরের শিশু সাজিদ। যে বয়সে তার হাত ভিজে থাকবার কথা মায়ের কোলে, যে বয়সে পৃথিবীটাকে সে চিনতে শুরু করবে খেলার ছলে—সেই বয়সেই তাকে লড়াই করতে হয়েছে মৃত্যুর সঙ্গে।
বুধবার (১০ ডিসেম্বর) দুপুরে খেলার ফাঁকে অসাবধানতাবশত পড়ে যায় ৩০০ ফুট গভীর সেই নলকূপের পাইপে। শব্দ নেই, আলো নেই, চারদিক অন্ধকার—কিন্তু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পুরো জাতি আশা করেছিল সাজিদ ফিরে আসবে মায়ের কাছে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী দল ছুটে যায় ঘটনাস্থলে। রাত-দিন ভুলে, ঠাণ্ডা মাটিতে বসে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা উদ্ধার অভিযান চালাতে থাকে তারা। মানুষের স্রোত, কান্নামিশ্রিত দোয়া, আতঙ্কে স্থবির পরিবার—সব মিলিয়ে তানোর যেন এক বেদনাবিধুর অশ্রুসাগরে পরিণত হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার রাত ৮টা ৫০ মিনিটে, অবশেষে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে। ছোট্ট সাজিদকে উদ্ধার করা হয়। মুহূর্তটিতে উপস্থিত হাজারো মানুষের হূদয়ে আশার আলো জ্বলে ওঠে। মনে হয়—এবার বুঝি বাঁচবে!
কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম, হৃদয়বিদারক। হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান—সাজিদ আর নেই। আশার আলো নিভে যায়, দেশের আকাশে নেমে আসে অসহ্য বিষাদের ছায়া।
একটি পরিত্যক্ত নলকূপ, একটুখানি অবহেলা—আর তাতেই থেমে গেল একটি টলমলে জীবনের যাত্রা। সাজিদের মৃত্যু শুধু একটি শিশুর মৃত্যু নয়—এ যেন আমাদের সামাজিক উদাসীনতার নির্মম প্রতিফলন। চারপাশে যত পরিত্যক্ত ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা পড়ে আছে, তার প্রতিটিই নিঃশব্দে লুকিয়ে রেখেছে ভয়ঙ্কর বিপদ।
উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের নিষ্ঠা, মানুষের প্রার্থনা আর রাষ্ট্রের তৎপরতা—সবকিছু মিলিয়ে এই ঘটনাটি দেশকে এক মুহূর্তের জন্য একই সুতোয় বাঁধা অনুভূতি দিয়েছে। এমন সহমর্মিতা আর মানবিকতা দেখলে বিশ্বাস জন্মায়—মানুষ এখনও মানুষের জন্য বাঁচে।
আজ সাজিদকে দাফন করা হয়েছে। ছোট্ট সেই দেহটি মাটির নিচে শুয়ে আছে অথচ বুকভরা আক্ষেপে পুরো জাতি।
যেন আর কোনো মা তার শিশুকে হারিয়ে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে না পড়েন… যেন আর কোনো গর্ত, কোনো অব্যবস্থাপনা, কোনো অবহেলা-একটি নিষ্পাপ প্রাণকে গ্রাস করতে না পারে।
সাজিদ, তোমার ছোট্ট জীবন একটি বড় শিক্ষা দিয়ে গেল। তুমি চলে গেছ, কিন্তু তোমার গল্প আমাদের ভেতর থেকে থেকে মনে করিয়ে দেবে-জীবন কতটা ভঙ্গুর, আর দায়িত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ।