বরিশাল আধুনিক ক্যান্সার হাসপাতালের নির্মাণ কাজে গণপূর্ত বিভাগের মেডিকেল জোনের প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, গাফিলতি ও তদারকির অভাবের অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের প্রতিটি ধাপে কাজের ধীরগতি, বাজেট বাড়ানো, মেয়াদ পুনঃনির্ধারণ এবং অর্থপ্রদান জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি স্থবির হয়ে আছে। অনলাইনে পাওয়া বিভিন্ন সরকারি নথি, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং ঠিকাদারি সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে এসব অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে।
২০২১ সালের ২৩ জুলাই বরিশালে ১৭ তলা বিশিষ্ট আধুনিক ক্যান্সার, হৃদরোগ ও কিডনি হাসপাতাল নির্মাণের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ৪৬০ শয্যার এই হাসপাতালটি ২০২৩ সালের জুলাইয়ে চালু হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেছে বহু আগেই। পরবর্তীতে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়। তবে এখনো পর্যন্ত প্রকৃত কাজের অগ্রগতি মাত্র ৪৫ শতাংশের মতো— যা প্রকল্পের ব্যর্থ ব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাবকে স্পষ্ট করে।
তথ্য অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করা হলেও এখনো ১২ কোটির বেশি বিল বকেয়া রয়েছে। বাজেট প্রথমে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ধরা হলেও পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে ১২৮ কোটিতে পৌঁছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দফা ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্পের সর্বশেষ হিসাব দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩৯ কোটি টাকায়। ব্যয় বাড়লেও কাজের গতি বা মান— দুটোই নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই।
কাজের বিভিন্ন ধাপে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, স্থাপত্য কাঠামোর ত্রুটি, অযথা কাজ বন্ধ রাখা, নির্ধারিত শ্রমিক সংকট ইত্যাদি বিষয়ে অভিযোগ করেছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি। সরেজমিন তথ্য ও অনলাইনে পাওয়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, বিলম্বিত কাজ ও অর্ধসমাপ্ত অবকাঠামোতে নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগের মেডিকেল জোনের দায়িত্বশীল প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে তদারকির অভাব, মাঠ পর্যায়ে উপস্থিত না থাকা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে গোপন যোগসাজশ এবং প্রকল্পের আর্থিক প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অভিযোগকারীরা বলছেন, “যদি নিয়মিত মনিটরিং হতো, তবে এখন পর্যন্ত হাসপাতালটির ৮০–৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে যেত।
বরিশাল অঞ্চলজুড়ে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। চিকিৎসার জন্য প্রতিনিয়ত ঢাকায় ছুটতে হচ্ছে রোগীদের— এতে বাড়তি খরচ ও ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আধুনিক ক্যান্সার হাসপাতাল চালু হওয়া ছিল দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। কিন্তু অনিয়ম ও বিলম্বে প্রকল্পটি বার বার ঝুলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে।
স্বাস্থ্যখাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসায় অঞ্চলভিত্তিক আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। বরিশালের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় দেশের দক্ষিণাঞ্চল স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। তাদের মতে, অনিয়ম ও দুর্নীতির সঠিক তদন্ত হলে প্রকল্পের আসল চিত্র সামনে আসবে।
বরিশাল আধুনিক ক্যান্সার হাসপাতাল প্রকল্পটি দক্ষিণাঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষের জন্য আশীর্বাদ হওয়ার কথা থাকলেও, অনিয়ম, দুর্নীতি, বাজেট বৃদ্ধি ও প্রকৌশলীদের দায়িত্বহীনতায় প্রকল্পটি এখন চরম দুরবস্থায়। জরুরি ভিত্তিতে স্বচ্ছ তদন্ত, তদারকি বৃদ্ধি এবং ত্বরিত কাজ সম্পন্ন না হলে বরিশালবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা আরো বিলম্বিত হবে।