মন্তব্য কলাম ; আসাদুজ্জামান মুরাদ
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদীর বজ্রকণ্ঠে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বল বীর’ কবিতা—শুধু একটি আবৃত্তি নয়, তা ছিল এক সময়ের প্রতিবাদ, এক জাতির ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা স্বদেশপ্রেমকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান। সেই কণ্ঠ শুনে অনেকের মতো আমারও রক্তে আগুন জ্বলে উঠেছিল। জ্বলে উঠেছিল দেশকে ভালোবাসার তীব্র অনুভূতি।
কিন্তু আজ বাস্তবতা নির্মম। হাদী হয়তো আর কোনোদিন আগের মতো হবে না। বাঁচুক বা না বাঁচুক—তার জীবনে যে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা আর মুছে যাওয়ার নয়। এই সত্যটি উচ্চারণ করাই কঠিন। এর চেয়েও কঠিন—তার পরিবারের অবস্থার কথা কল্পনা করা। একদিন যে মানুষটি হাজারো মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল, আজ তার চারপাশে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতার ভার সবচেয়ে বেশি বইতে হচ্ছে তার আপনজনদের।
আমরা অনেক সময় আশ্বাস দিই—“হাদী হবে।” কথাটা শুনতে ভালো, সাহস জাগায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, হাদীর মতো মানুষ কোটিতে একজন জন্মায়। চাইলেই হওয়া যায় না। এমন কণ্ঠ, এমন দৃঢ়তা, এমন আত্মনিবেদন—এসব স্রষ্টার দান। দ্বিতীয়টি ইচ্ছেমতো পাওয়া যায় না। ইতিহাসে তাই কিছু নাম একবারই আসে, আবার ফিরে আসে না।
আরও নির্মম সত্য হলো—জনগণ তাকে ভুলে দিতে পেরেছিল। যখন তিনি নীরবে লড়াই করছিলেন, তখন আলো-আড়ালের ভিড়ে তার কণ্ঠ ক্রমে ম্লান হয়ে যাচ্ছিল। কেউ কেউ গোপনে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল, টাকা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু হাদী সেই টাকা নিজের জন্য রাখেননি। মানুষের জন্য আসা অর্থ মানুষেই ফিরিয়ে দিয়েছেন। নিজের সংসার টেনেছেন টানাটানি করে, অভাবকে সঙ্গী করে।
আজ আমরা যে যার মতো ভালো আছি। দৈনন্দিন ব্যস্ততায় জীবন এগিয়ে চলছে। কিন্তু এই দেশের মানুষের জন্য চরম ত্যাগ করে গেছেন হাদী—এবং সেই ত্যাগের বোঝা বইছে তার পরিবার। তারা কোনো শিরোনাম চায় না, চায় না করুণা। চায় শুধু এই স্বীকৃতি—এই ত্যাগ বৃথা যায়নি।
হাদীর কণ্ঠ আমাদের একদিন আগুন জ্বালিয়েছিল। আজ সেই আগুন যেন আমাদের বিবেককে পোড়ায়। প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি সত্যিই তাদের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি, যারা আমাদের হয়ে দাঁড়িয়েছিল? ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানো সহজ নয়। কিন্তু যারা নিঃশব্দে ইতিহাস গড়ে, তাদের ভুলে যাওয়াই সবচেয়ে বড় অন্যায়।
এই কলাম কোনো আহ্বান নয়, কোনো শোকগাথাও নয়। এটি স্মরণ—যাতে আমরা ভুলে না যাই। কারণ, হাদীর মতো মানুষরা হারিয়ে গেলে শুধু একজন নয়, একটি সময়, একটি কণ্ঠ, একটি সাহস হারিয়ে যায়।