সরকারি অর্থে প্রায় ৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে বরিশাল নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পোর্ট রোড পুনঃনির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৭ কোটি টাকার এই প্রকল্পে নির্মাণাধীন মাত্র ৫০০ মিটার সড়কের মাঝখানে একটি স্থাপনা রেখেই নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রকল্পের পরিকল্পনা, নকশা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, পোর্ট রোডের একটি অংশে সড়কের ওপর রডের জাল বিছিয়ে ঢালাইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সড়কের নির্ধারিত অংশের মধ্যেই রয়েছে একটি দোকানঘর। স্থাপনাটিকে বাদ দিয়ে কিংবা ঘিরে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে সড়কের নির্ধারিত প্রশস্ততা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সড়ক নির্মাণের আগে স্থাপনাটি অপসারণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি নাÑএ প্রশ্নেরও স্পষ্ট জবাব মিলছে না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। পোর্ট রোডের এ বিষয়ে বরিশাল বন্দর নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাস্তা সংস্কারের সময় যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে, তা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কারণে। বিষয়টি তিনি দেখবেন।
তবে সড়কের মাঝখানে থাকা স্থাপনাটি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমজাদ হোসেন ভালো বলতে পারবেন। অন্যদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমজাদ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সড়কের মধ্যে থাকা দোকানটি বিআইডব্লিউটিএর স্থাপনা। কেন সেটি সড়কের মধ্যেই রাখা হয়েছেÑএ প্রশ্নের জবাবে তিনি বিষয়টি বন্দর নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান ভালো জানেন বলে জানান।
দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, স্থাপনাটি নিয়ে একে অপরের ওপর দায়িত্ব ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অথচ সরকারি অর্থে বাস্তবায়নাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রকল্পে নির্মাণকাজ শুরুর আগেই নকশা অনুযায়ী সড়কের জায়গা নিশ্চিত করা এবং প্রতিবন্ধকতা দূর করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদেরই। ফলে নির্মাণকাজ চলার সময় সড়কের মাঝখানে স্থাপনা থাকার বিষয়টি কীভাবে সম্ভব হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম খান রাজন বলেন, মানুষের চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি করে এমন কোনো স্থাপনা থাকলে তা অপসারণের ব্যবস্থা করা হবে। সংশ্লিষ্ট স্থাপনাটির বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা সংশ্লিষ্ট কেউ জড়িত রয়েছেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।
বিষয়টি বরিশালের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মামুন খন্দকারকে জানানো হলে তিনি সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। জেলা প্রশাসক বলেন, “স্থাপনাটি রাস্তার মধ্যেই পড়েছে। রাস্তার এলাইনমেন্ট অনুযায়ীই সড়ক নির্মাণ করা হবে। সেখানে কোনো অবৈধ স্থাপনা থাকলে তা অবশ্যই অপসারণ করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিআইডব্লিউটিএর সঙ্গে কথা হয়েছে এবং স্থাপনাটি অপসারণের জন্য বলা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ স্থাপনাটি অপসারণ না করলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোটি টাকার প্রকল্প, প্রশ্ন বাস্তবায়ন নিয়ে প্রায় ৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে পোর্ট রোডের মাত্র ৫০০ মিটার (আধা কিলোমিটার) অংশ পুনঃনির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। প্রকল্পের আওতায় টেকসই আরসিসি সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি দুই পাশে ড্রেনেজ ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে সড়কের পাশের কয়েকটি স্থাপনা নিয়ে জটিলতার কারণে ড্রেনের একটি অংশের নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ থাকার বিষয়টিও সামনে আসে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, জমি নিয়ে মামলা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ঐ অংশের কাজ আপাতত করা হয়নি। তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজ পুরোপুরি শেষ না হলে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনে ভোগান্তি বাড়বে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়ার পরও সড়কের জায়গায় থাকা স্থাপনা আগে থেকে চিহ্নিত করে অপসারণ করা হলো না কেন? আর যদি স্থাপনাটি বিআইডব্লিউটিএ’র হয়, তাহলে সড়কের মাঝখানে সেটি রেখে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তই বা কে নিয়েছেন? তাদের দাবি, সরকারি অর্থের এই প্রকল্পে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের কারণে সড়কের নকশা ও নির্ধারিত এলাইনমেন্ট যেন পরিবর্তিত না হয়।
স্থাপনাটি দ্রুত অপসারণ করে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী পুরো সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ এবং প্রকল্পের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।