নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল:
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নিউরোমেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. অমিতাভ সরকারকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একের পর এক অভিযোগ তুলেছেন রোগী ও স্বজনরা।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে, সিরিয়াল পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও জটিলতা, অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো, নির্দিষ্ট স্থানে পরীক্ষা করানোর চাপ এবং সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখার বিষয়।
সম্প্রতি ডা. অমিতাভ সরকারকে নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদে পাঠকদের মন্তব্যের ঘরে এসব অভিযোগ উঠে আসে। অনেকেই নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে চিকিৎসকের সিরিয়াল ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
একজন মন্তব্যকারী দাবি করেন, ডা. অমিতাভের কাছে সিরিয়াল নেওয়া ‘একটি যুদ্ধের মতো’। তার অভিযোগ, ভোররাতে গিয়ে নির্দিষ্ট খাতায় নাম লেখাতে হয় এবং সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। সময়মতো উপস্থিত না থাকলে তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার অভিযোগও করেন তিনি।
আরেকজন মন্তব্যকারী দাবি করেন, সকাল ৯টার আগে গিয়ে সিরিয়াল নিশ্চিত করতে হয় এবং এর জন্য অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। এরপর চিকিৎসকের নির্ধারিত ভিজিট দেওয়ার পর রোগী দেখানো হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ফেসবুকের একাধিক মন্তব্যে ডা. অমিতাভ সরকারের কাছে চিকিৎসা নিতে গিয়ে একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর অভিযোগ করা হয়েছে। কয়েকজন মন্তব্যকারী দাবি করেন, চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর বিভিন্ন পরীক্ষা দেওয়া হয় এবং নির্দিষ্ট স্থানে পরীক্ষা সম্পন্ন করে রিপোর্ট নিয়ে আবার চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়।
একজন মন্তব্যকারী অভিযোগ করেন, পরীক্ষা না করা পর্যন্ত তাকে ওষুধ দেওয়া হয়নি। আবার আরেকজন দাবি করেন, চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ কেনা হয়েছে কি না, সেটিও পরবর্তীতে দেখানো হয়।
তবে কোনো রোগীর ক্ষেত্রে পরীক্ষাগুলো চিকিৎসাগতভাবে অপ্রয়োজনীয় ছিল কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট রোগীর মেডিকেল রেকর্ড, চিকিৎসা-প্রটোকল ও বিশেষজ্ঞ মতামত প্রয়োজন। ফেসবুকের মন্তব্যের ভিত্তিতে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
অভিযোগকারীদের একটি অংশের প্রশ্ন, সরকারি চিকিৎসক হিসেবে ডা. অমিতাভ সরকার শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে সরকারি কর্মঘণ্টায় কতটা সময় দায়িত্ব পালন করেন।
তাদের দাবি, সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখায় ব্যস্ত থাকেন। ফলে সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ বা নির্ধারিত কর্মস্থলে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এক্ষেত্রে হাসপাতালের উপস্থিতি রেজিস্টার, দায়িত্বসূচি, বহির্বিভাগের রোগী দেখার তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
শুধু অমিতাভ নন, পুরো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার তদন্তের দাবি
ফেসবুকের মন্তব্যে শুধু ডা. অমিতাভ সরকার নয়, বরিশালের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালগুলোর কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
কয়েকজন মন্তব্যকারী দাবি করেছেন, নগরীতে বিপুলসংখ্যক ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বৈধ লাইসেন্স আছে কি না, পরীক্ষার রিপোর্ট কে তৈরি করেন, পরীক্ষাগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ হয় কি না এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে কোনো ধরনের আর্থিক বা রেফারেল সম্পর্ক রয়েছে কি না, এসব বিষয় নিয়ে সমন্বিত অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন তারা।
একজন মন্তব্যকারী সরাসরি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠানোর দাবি জানান।
ভালো চিকিৎসক—কিন্তু সিরিয়াল ব্যবস্থাপনা নিয়ে আপত্তি
তবে সব মন্তব্যই নেতিবাচক নয়। বেশ কয়েকজন মন্তব্যকারী ডা. অমিতাভ সরকারকে ভালো চিকিৎসক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার চিকিৎসা দক্ষতা, আচরণ ও ব্যবহারের প্রশংসাও করেছেন কেউ কেউ।
তাদের মূল আপত্তি চিকিৎসকের সিরিয়াল ব্যবস্থাপনা ও রোগী দেখার প্রক্রিয়া নিয়ে।
একজন মন্তব্যকারী লিখেছেন, চিকিৎসক হিসেবে তিনি ভালো হলেও সিরিয়াল ব্যবস্থাপনা খুবই দুর্বল। রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় কখনো কখনো দীর্ঘ সময় ধরে রোগী দেখতে হয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে কয়েকজন মন্তব্যকারী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় অভিযোগ করেছেন। এমনকি ভুল চিকিৎসার কারণে স্বজনের মৃত্যু হয়েছে, এমন দাবিও করেছেন কেউ কেউ। তবে এসব গুরুতর অভিযোগের পক্ষে কোনো চিকিৎসা নথি বা স্বাধীন তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
তদন্ত হলেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত সত্য
ফেসবুকের মন্তব্যে ওঠা অভিযোগগুলো এখন মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্য। এগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত।
স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে ডা. অমিতাভ সরকারের সরকারি কর্মঘণ্টায় উপস্থিতি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখার সময়সূচি, রোগী রেফার করার ধরন, পরীক্ষার পরামর্শ, সিরিয়াল ব্যবস্থাপনা এবং রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের বিষয়গুলো নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করতে পারে।
একই সঙ্গে বরিশালের বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর লাইসেন্স, অনুমোদন, জনবল, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মান এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে তাদের আর্থিক/রেফারেল সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
রোগীর অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা যেমন জরুরি।