নিজস্ব প্রতিবেদক
বরিশাল সদর উপজেলা বিএনপির সদ্য অনুমোদিত ১৬১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটিকে ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন কমিটিতে আলহাজ্ব নুরুল আমিনকে আহ্বায়ক এবং মো. সাইফুল ইসলাম আব্বাসকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। গত ১২ জুলাই ২০২৬ বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদের স্বাক্ষরে কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
দলীয় সূত্র জানায়, বরিশাল সদর উপজেলা বিএনপির পূর্ববর্তী পূর্ণাঙ্গ কমিটি এবং জেলা বিএনপি (দক্ষিণ)-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ কেন্দ্রীয় বিএনপির কাছে জমা পড়ে। অভিযোগের বিষয়ে দীর্ঘদিন যাচাই-বাছাই ও সাংগঠনিক মূল্যায়নের পর নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এ বিষয়ে বরিশাল সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ারের পরামর্শও গ্রহণ করা হয়েছিল।
নতুন আহ্বায়ক আলহাজ্ব নুরুল আমিনকে বিএনপির নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতা হিসেবে বর্ণনা করছেন। তাদের দাবি, ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ সময়ে তার বিরুদ্ধে ২৬টি রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয় এবং তিনি চারবার কারাবরণ করেন। মামলা, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক হয়রানি ও প্রশাসনিক চাপের মধ্যেও তিনি সংগঠনের কর্মকাণ্ড থেকে সরে যাননি।
নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক কারণে ব্যক্তিগত ব্যবসা ও পারিবারিক জীবনেও নানা ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন নুরুল আমিন। তারপরও তিনি দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন, নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো এবং সংগঠনকে সক্রিয় রাখতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছেন।
তার রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের মধ্যে রয়েছে ২০০৩ সালের বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ারের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন। এছাড়া তিনি বরিশাল সদর উপজেলার রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায়ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মতে, ২০১২ সালের ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচিতে বরিশাল থেকে বাধা অতিক্রম করে নেতাকর্মীদের ঢাকায় নিয়ে যাওয়া, ২০২২ সালের ৫ নভেম্বর বরিশালের ঐতিহাসিক গণসমাবেশ সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন এবং ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল সদর আসনে অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ারের নির্বাচনী কার্যক্রমে সক্রিয় সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন—এসবই নুরুল আমিনের রাজনৈতিক দক্ষতার পরিচায়ক।
তাদের দাবি, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, মাঠপর্যায়ের গ্রহণযোগ্যতা এবং দলের প্রতি অবিচল আনুগত্যের মূল্যায়ন হিসেবেই কেন্দ্রীয় বিএনপি তাকে সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব দিয়েছে।
সদর উপজেলা বিএনপির এক নেতা বলেন, “দলের সবচেয়ে কঠিন সময়েও নুরুল আমিন মাঠ ছেড়ে যাননি। মামলা-হামলা, কারাবরণ কিংবা রাজনৈতিক চাপ কোনো কিছুই তাকে রাজপথ থেকে সরাতে পারেনি। তৃণমূলের আস্থা ও দীর্ঘদিনের ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে।”
তবে নতুন কমিটি ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নুরুল আমিনকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। তাকে ‘জামায়াত’ সংশ্লিষ্ট আখ্যা দেওয়া, পদ বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেনসহ নানা অভিযোগ তুলে একাধিক পোস্ট করা হয়। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন ও বিক্ষোভ কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হয়।
এসব অভিযোগকে পরিকল্পিত অপপ্রচার হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষুব্ধ একটি মহল এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত কয়েকজন ব্যক্তি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, দলীয় ঐক্যে বিভক্তি সৃষ্টি করা এবং নুরুল আমিনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে এসব প্রচারণা চালাচ্ছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে আলহাজ্ব নুরুল আমিন বলেন, “আমি দল থেকে নেওয়ার জন্য রাজনীতি করিনি; বরং দলের জন্য কাজ করতেই রাজনীতি করি। দলের দুঃসময়ে নিজের অর্থ ব্যয় করে সংগঠনকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় বা দলীয় যেকোনো তদন্তের মুখোমুখি হতে আমি প্রস্তুত।”
তিনি আরও বলেন, “যারা আজ অপপ্রচার চালাচ্ছেন, তাদের অনেকেরই অতীতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। একটি স্বার্থান্বেষী মহল কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।”
রাজনীতির পাশাপাশি নুরুল আমিন বরিশালের ব্যবসায়িক ও সামাজিক অঙ্গনেও সুপরিচিত। তিনি আমিন জুয়েলার্স গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডের স্বত্বাধিকারী, দি বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক, বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) বরিশাল জেলা ও বিভাগীয় শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং দৈনিক বরিশাল বার্তা পত্রিকার সম্পাদক। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
এদিকে বরিশাল সদর উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয়ভাবে অনুমোদিত কমিটিকে ঘিরে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য প্রচার দলীয় ঐক্য ও সাংগঠনিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই তারা গুজব ও অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন।