বরিশাল নগরীতে মূর্তিমান আতঙ্কে পরিণত হয়েছে রুবেল শরীফ (৪০) ওরফে ‘নাক কাটা রুবেল’ এবং তার সশস্ত্র বাহিনী। একের পর এক মামলা, জেলহাজত ও গ্রেপ্তারের পরও আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে এসে আবারও সে কায়েম করছে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও প্রকাশ্য সন্ত্রাসের রাজত্ব। নগরীর দক্ষিণ আলেকান্দা রিফিউজি কলোনি এখন তার অপরাধ সাম্রাজ্যের প্রধান ঘাঁটি।
সর্বশেষ চলতি মাসের ১৭ ডিসেম্বর রাতে রিফিউজি কলোনির বাসিন্দা মো. মোফাজ্জেল কাজীর ছেলে মো. সুজন কাজী বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি চারজনকে অভিযুক্ত করেন। তারা হলেন—একই কলোনির মৃত আলতাফ শরীফের ছেলে রুবেল ওরফে নাক কাটা রুবেল, তার ভাই আবুল বাসার ওরফে রাজন (৪২), মৃত আক্তার কসাইয়ের ছেলে তুহিন (৩০) এবং ছালামের ছেলে সোহেল (২৮)।
স্থানীয় ও থানা-আদালত সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৩ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৯টার দিকে রিফিউজি কলোনির সামনে রুবেলের মুদির দোকানে বসে নাক কাটা রুবেল, তার ভাই রাজন, হৃদয়, ছানি ও আছিব ফার্নিচার ব্যবসায়ী সোহাগ কাজীর কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সোহাগকে প্রকাশ্যে বেধড়ক মারধর করা হয়।
হামলার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন সোহাগের গর্ভবতী স্ত্রী শিউলি। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই সময় নাক কাটা রুবেল শিউলির পেটে সজোরে লাথি দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় শিউলিকে প্রথমে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হলে আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে চিকিৎসকরা জানান—গর্ভের শিশুর মাথায় মারাত্মক আঘাতের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। পরবর্তীতে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে মৃত সন্তান বের করা হয়।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনার ঘটনায় চলতি বছরের ৩০ জুন বরিশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শিউলির বোন সিম্মী (২৩) বাদী হয়ে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
এর আগে চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টার দিকে বটতলা আমির কুটির হরিজন কলোনি (মেথর পট্টি) এলাকায় মো. সবুজ (২৯) ওরফে ভাগিনা মিলনকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয় রুবেল, অলি, তুহিন ও সোহেলের নেতৃত্বে ১০–১২ জনের একটি সন্ত্রাসী দল। গুরুতর আহত মিলনকে শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করে পরে ঢাকায় পাঠানো হলেও রহস্যজনক কারণে ওই ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নাক কাটা রুবেল ও তার ভাই রাজনের বাড়ি পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার পূর্ব কার্তিকপাশা গ্রামে। নিজ এলাকায় নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় এক পর্যায়ে এলাকাবাসীর হাতে রুবেলের এক পা ভেঙে যায়। এরপর তারা বরিশাল নগরীর বাংলাবাজার এলাকার শহীদ আলতাফ স্কুল সংলগ্ন এলাকায় এসে ঘাঁটি গড়ে তোলে।
বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় রুবেলের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—২০০৯ সালের ১৬ অক্টোবরের ৫১ নং, ২০১৩ সালের ১০ জুনের ৮ নং এবং ২০২৩ সালের ৫ জুনের ৯ নং মামলা। তার ভাই রাজনের বিরুদ্ধেও রয়েছে ২০২৩ সালের ৫ জুনের ৯ নং ও ২০২৪ সালের ২৩ মার্চের ৬০ নং মামলা।
নাক কাটা রুবেলের ছত্রছায়ায় বাংলা বাজার সংলগ্ন আরশেদ আলী কন্ট্রাক্টর গলির ভাড়াটিয়া বাসিন্দা অলি (১৯) নিয়মিত ইয়াবা বিক্রি করছে। চলতি বছরেই সে ৩–৪ বার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছে।
রিফিউজি কলোনির শাহিন (৩৫) ও তুহিন (৩০) ‘ইয়াবা শাহিন–তুহিন’ নামে পরিচিত। বড় ভাই রুবেলের কাছ থেকে ইয়াবা এনে ছোট ভাই বিক্রি করে। তুহিনের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মাদক মামলা।
রুবেলের মামাতো ভাই সোহেল ওরফে বাবা সোহেল, সহযোগী বাপ্পী, এবং প্রধান ইয়াবা সরবরাহকারী হাড্ডি জাহাঙ্গির—সবার বিরুদ্ধেই রয়েছে একাধিক মামলা। সর্বশেষ চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি ডিবি পুলিশের একটি অভিযানে হাড্ডি জাহাঙ্গিরের বাসা থেকে ২০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, এই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সঙ্গে নগরীর ১৪ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ সভাপতি তানভীর হোসেন হীরা ও বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক রইজ আহমেদ মান্নার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে।
রিফিউজি কলোনির একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলা হলেও কেউই প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, “সবাই জানে ওরা কারা, কী করে। কিন্তু মুখ খুললেই বিপদ।
এদিকে প্রশ্ন উঠেছে—একাধিক মামলা, গুরুতর অভিযোগ ও ভয়াবহ অপরাধের পরও নাক কাটা রুবেল ও তার বাহিনী কীভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে? নগরবাসীর দাবি, অবিলম্বে এই সন্ত্রাসী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়ে আইনের আওতায় আনা হোক।