একটির পর একটি অভিযোগ, উন্নয়নকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতা এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে ‘পার্সেন্টিজ’ নেওয়ার অভিযোগ, সব মিলিয়ে বরিশালের উজিরপুর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী সুব্রত রায়কে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। এত অভিযোগ ও বিতর্কের পরও তিনি বহাল তবিয়তে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, সুব্রত রায়ের ‘খুঁটির জোর’ কোথায়?
সর্বশেষ তার বিরুদ্ধে পৈতৃক জমি ও পূর্বপুরুষের কবরস্থান উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন মো. মাসুম হাওলাদার। এ ঘটনায় গত ১ সেপ্টেম্বর এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী, বরিশাল জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি।
অভিযোগে মাসুম হাওলাদার দাবি করেন, উজিরপুরের ধামুড়া–শোলক সড়কের সন্ধ্যা নদীর শাখা নদীর ওপর নির্মিত সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করে তাদের পৈতৃক জমি ও পারিবারিক কবরস্থান সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপত্তি জানালে মামলা দেওয়ার ভয় দেখানোরও অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৬ কোটি ৮৩ লাখ ৩৯ হাজার ৫৩৫ টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটির মূল কাজ প্রায় দেড় বছর আগে শেষ হলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতুতে ওঠার জন্য কোথাও কোথাও মই ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এদিকে প্রকৌশলী সুব্রত রায়ের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন উন্নয়নকাজের মান ও তদারকি নিয়ে অভিযোগ ওঠে। ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হারতা নয়াকান্দি ফুটব্রিজ–দক্ষিণ সাতলা সড়ক নির্মাণের মাত্র দুই মাসের মধ্যে বেহাল হয়ে পড়ায় প্রকল্পের মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কথিত ‘পার্সেন্টিজ’ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এছাড়া সানুহার–ধামুরা সড়ক সংস্কারের দাবিতে মানববন্ধন করা শিক্ষার্থীদের শাসানো ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভারপ্রাপ্ত কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের উদ্দেশে ‘প্রয়োজনে লাশ পড়বে, চেয়ার ছাড়বো না’, এমন হুমকি দেওয়ার অভিযোগও অতীতে আলোচনায় আসে বলে স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে প্রকৌশলী সুব্রত রায়ের বক্তব্য জানা যায়নি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন সরকারি প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে যদি একের পর এক অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেগুলোর বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্ত হচ্ছে কি না? তদন্ত হয়ে থাকলে তার ফলাফল কী? আর অভিযোগগুলোর সত্যতা না মিললে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, এসব প্রশ্নেরও উত্তর চান তারা।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা নিয়মিতভাবে সুব্রত রায়কে ‘সেল্টার’ দিয়ে আসছেন। ওই কর্মকর্তার প্রভাবেই কি একের পর এক অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয়দের মধ্যে। তবে কথিত ‘সেল্টারদাতা’ কর্মকর্তার নাম বা এ অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, সুব্রত রায়ের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা হোক। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দ্রুত বদলিসহ বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ে জানানোর কথাও জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
সব মিলিয়ে উজিরপুর এলজিইডিকে ঘিরে প্রশ্ন এখন একটাই, এত অভিযোগের পরও কেন অটুট সুব্রত রায়ের চেয়ার? সত্যিই কি তার পেছনে কোনো ‘অদৃশ্য খুঁটির জোর’ রয়েছে, নাকি অভিযোগগুলোর কোনোটিই তদন্তে প্রমাণিত হয়নি?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রকাশ্য তদন্ত।