পরনে মুজিব কোট, বুকে স্বর্ণের নৌকার ব্যাজ, এভাবেই দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলম। তিনি সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর ঘনিষ্ঠজন ও ‘পালিত পুত্র’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পরও রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখা, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মসহ নানা অভিযোগে বর্তমানে তিনি আলোচনার কেন্দ্রে।
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে ফয়সাল আলমের বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকার পরিবর্তনের পরও কৌশলে নিজের প্রভাব বলয় ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি বরিশাল জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গেও বিভিন্ন বিষয়ে তার বাকবিতণ্ডা হয়েছে। এক পর্যায়ে তার দপ্তরের কক্ষে কথা কাটাকাটির ঘটনা ঘটে। পরে ওই কক্ষের সিসিটিভি ফুটেজ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফুটেজ প্রকাশের মাধ্যমে বিএনপি নেতাকর্মীদের সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে।
ফয়সাল আলম ৩২তম বিসিএসের কর্মকর্তা এবং ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার শুক্তঘর এলাকার বাসিন্দা। ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময়ে আমুর পছন্দের ঠিকাদারদের নিয়মবহির্ভূতভাবে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। সাধারণ ঠিকাদাররা লিখিত অভিযোগ করলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কার্যকর তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
বরিশালে বদলি হওয়ার পরও ফয়সাল আলমকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ থামেনি। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠ বলয়েও তিনি প্রভাব বিস্তার করেন। এরপর পছন্দের ঠিকাদারদের সরকারি প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, খান বিল্ডার্স ও খান ট্রেডার্স নামের দুটি প্রতিষ্ঠানকে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের শত শত কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে বরিশাল মেরিন একাডেমি, বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার, ক্যান্সার হাসপাতাল, বিটাক, তালতলী মডেল মসজিদ, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, বিমানবন্দর থানা ভবন এবং শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বিশেষ করে ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঠিকাদাররা। তাদের দাবি, প্রাথমিক কাজ শেষ হওয়ার পরও বাজেট বাড়ানোর নামে পুনরায় বরাদ্দ আদায়ের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি না থাকা প্রতিষ্ঠানকে যৌথ উদ্যোগ দেখিয়ে টেন্ডারে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, যৌথ উদ্যোগে লিড পার্টনারের নির্দিষ্ট অংশগ্রহণের শর্ত থাকলেও বাস্তবে তা যথাযথভাবে মানা হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা ও তদন্ত দাবি করেছেন তারা।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশাল গণপূর্ত কার্যালয়ে এসব অভিযোগের প্রতিবাদ জানাতে গেলে ঠিকাদারদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবাদকারীদের লাইসেন্স বাতিল ও কালো তালিকাভুক্ত করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন কয়েকজন ঠিকাদার।
ঠিকাদার আব্দুর রহিম ও তসলিম মৃধার অভিযোগ, “ফয়সাল আলমের কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ ঠিকাদাররা সরকারি প্রকল্প থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিষয়টির দ্রুত সমাধান না হলে সরকারি প্রকল্পের মান ও বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।”
ঠিকাদার এটিএম আশরাফুল হক রিপনের অভিযোগ, “ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি না থাকা প্রতিষ্ঠান কীভাবে টেন্ডারে অংশ নিল, তা ফয়সাল আলমকে ব্যাখ্যা দিতে হবে।” তিনি নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে তদন্ত দাবি করেন।
এদিকে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্য হিসেবে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের স্বার্থ রক্ষা করা হলে সাধারণ ঠিকাদাররা বঞ্চিত হন এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়া দুর্নীতির ঝুঁকি তৈরি করে।
তবে ফয়সাল আলমের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কিংবা ব্যক্তিগত বলয়ের ভিত্তিতে সরকারি প্রকল্পের কাজ বণ্টন করা হলে সরকারি ক্রয় ও টেন্ডার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাই ফয়সাল আলমকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীরা।
তাদের প্রত্যাশা, দুদক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।