আসাদুজ্জামান মুরাদ
গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ-যেখানে সত্য উচ্চারিত হয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়। কিন্তু যখন সেই সত্য বলার দায়ে একজন সাংবাদিককে হাতকড়া পরিয়ে থানায় পাঠানো হয়, তখন প্রশ্ন জাগে-আমরা কি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক সমাজে বাস করছি?
চান্দিনা উপজেলার ভূমি অফিসে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাটি শুধু দুইজন সাংবাদিকের অপমান নয়; এটি পুরো গণমাধ্যম জগতের জন্য এক অশনি সংকেত। দৈনিক মানবজমিনের প্রতিনিধি রাসেল সরকার এবং ফেস দ্য পিপল ও দৈনিক আমার শহরের প্রতিনিধি আবদুল আলীম, দুইজনই গিয়েছিলেন একটি নামজারি সংক্রান্ত শুনানিতে, তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে। কিন্তু সেই দায়িত্বই যেন তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল।
অভিযোগ উঠেছে, ফয়সাল আল নূর, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), নিজের দপ্তরে ভিডিও ধারণের কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে সাংবাদিকদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং পরবর্তীতে তাদের হাতকড়া পরিয়ে থানায় পাঠানোর নির্দেশ দেন। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তার এমন আচরণ কি ক্ষমতার অপব্যবহার নয়?
সাংবাদিকদের কাজ হলো প্রশ্ন করা, সত্য তুলে ধরা। তারা যদি কোনো অনিয়ম বা দুর্ব্যবহার দেখেন, সেটি লিপিবদ্ধ করা কি অপরাধ? নাকি সেই সত্য প্রকাশের ভয়েই এই দমন-পীড়ন?
এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একজন সরকারি কর্মকর্তা নিজেই আইনের সীমা লঙ্ঘন করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছেন। হাতকড়া পরানো, যা সাধারণত গুরুতর অপরাধীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, তা কি শুধুমাত্র ভিডিও ধারণের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর আজ পুরো জাতির জানা দরকার।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কেবল ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ পালন করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আইনের শাসন কি কেবল নির্দেশ পালনেই সীমাবদ্ধ, নাকি সেখানে ন্যায়-অন্যায়ের বিচারও থাকা উচিত?
এই ঘটনার ছবি যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সাংবাদিক সমাজ-সবাই ক্ষোভে ফেটে পড়ে। কারণ এটি শুধু দুইজন ব্যক্তির অপমান নয়, এটি সত্য বলার অধিকারকে শৃঙ্খলিত করার চেষ্টা।
আজ যদি একজন সাংবাদিক তার কাজ করতে গিয়ে হাতকড়া পরেন, তাহলে আগামীকাল সাধারণ মানুষ কি নিরাপদ থাকবে? এই প্রশ্ন আমাদের সকলের।
গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা মানে সমাজের চোখ বন্ধ করে দেওয়া। আর চোখ বন্ধ করে রাখলে অন্যায়ই শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহিতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কারণ, কলম থেমে গেলে সত্য থেমে যায়-আর সত্য থেমে গেলে সমাজ অন্ধকারে ডুবে যায়।