বরিশালের উজিরপুরে মাদ্রাসা শিক্ষকের বাসা দখলচেষ্টা ও চাঁদাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে আয়োজিত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আহতদের মধ্যে ৩ থেকে ৪ জনকে গুরুতর অবস্থায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
শুক্রবার উজিরপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ রয়েছে, গুঠিয়া ইউনিয়নের চরমোনাই কামিল মাদ্রাসার প্রভাষক ও উজিরপুর উপজেলা মুজাহিদ কমিটির সদর মুফতি মাসউদ হাসান ফিরোজের বাসভবনে হামলা, লুটপাট ও তার পরিবারকে উচ্ছেদের প্রতিবাদে মানববন্ধন চলাকালে উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও গুঠিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহীন হাওলাদার এবং তার অনুসারীরা হামলা চালান।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের উজিরপুর উপজেলা শাখার নেতা মোহাম্মাদ আল-আমীন বলেন, মুফতি মাসউদ হাসান ফিরোজ একজন সম্মানিত আলেম। তার বাসভবনে হামলা ও পরিবারের সদস্যদের মারধরের প্রতিবাদে আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছিলাম। পুলিশের অনুরোধে কর্মসূচি শেষ করার সময় শাহীন হাওলাদার ও তার লোকজন আমাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে। পরে তারা পূর্বে মজুত রাখা ইটপাটকেল ছুড়ে হামলা চালায়। একপর্যায়ে লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমাদের ওপর আক্রমণ করা হয়।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাহীন হাওলাদার। তিনি বলেন, আমি উপজেলা প্রশাসনের একটি সরকারি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম। অনুষ্ঠান শেষে বের হওয়ার সময় ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা আমাকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। আমি হামলার শিকার হয়েছি। আমার পকেট থেকে প্রায় দুই লাখ টাকা ও গলার চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।”
ঘটনার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান,
“একটি সরকারি অনুষ্ঠান শেষে বাইরে এসে দেখি উভয়পক্ষ একে অপরের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত দেখে আমি দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাই। হতাহতের সংখ্যা বা ছিনতাইয়ের অভিযোগ সম্পর্কে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।
উজিরপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বলেন,
“কিছু আলেম-ওলামা উপজেলা পরিষদের সামনে মানববন্ধন করছিলেন। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে তাদের কর্মসূচি শেষ করার অনুরোধ জানানো হয় এবং তারা তা মেনে নেন। পরে দুই পক্ষ মুখোমুখি হলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং উভয়পক্ষ ইটপাটকেল নিক্ষেপে জড়িয়ে পড়ে। পুলিশ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।”
এদিকে সংঘর্ষের মূল সূত্র হিসেবে সামনে এসেছে গুঠিয়া বন্দরের একটি বহুতল ভবনের মালিকানা নিয়ে বিরোধ।
মুফতি মাসউদ হাসান ফিরোজ দাবি করেন, ২০১০ সালে তিনি জমিটি ক্রয় করেন এবং পরবর্তীতে রেকর্ড, খাজনা প্রদানসহ সব আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। ২০১৬ সালে সেখানে ভবন নির্মাণ শুরু করেন, যা বর্তমানে তিনতলা পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে।
তার অভিযোগ, সম্প্রতি জমির পূর্ব মালিকপক্ষকে উসকে দিয়ে বিএনপি নেতা শাহীন হাওলাদার ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লাবলু চাপরাসি তার কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ২০-২৫ জনের একটি দল তার বাসভবনে হামলা চালায়, স্ত্রী ও সন্তানদের মারধর করে, শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে এবং জোরপূর্বক বাসা থেকে বের করে তালা লাগিয়ে দেয়।
এ ঘটনায় তিনি বরিশাল জজ কোর্টে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছেন বলে জানান।
অন্যদিকে শাহীন হাওলাদার এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে বলেন, মুফতি ফিরোজের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নেই। আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আমি প্রার্থী হতে পারি, তাই আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে আমাকে জড়িয়ে মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে। আমি কিংবা আমাদের সাধারণ সম্পাদক এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো গুঠিয়া এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।