অহিদুজ্জামান রানা
২০১০ সালের দিকে সিদ্ধান্ত নিলাম, যেভাবেই হোক এমবিএটা শেষ করব। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল অন্য জায়গায়। তখন আমি দেশের একটি স্বনামধন্য বহুজাতিক বিজ্ঞাপনী সংস্থায় চাকরি করি। কাজের চাপ ও পেশাগত ব্যস্ততা এতটাই বেশি ছিল যে পড়াশোনার জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাই চাকরি ছেড়ে তুলনামূলক কম বেতন ও কম কাজের চাপ রয়েছে—এমন একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা ভাবছিলাম।
এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে দ্বারস্থ হলাম আমাদের সবার প্রিয় প্রয়াত আকমল মোস্তফা টিপু ভাইয়ের। তখন তিনি পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মরত ছিলেন। আমার ইচ্ছার কথা শুনে তিনি বললেন, এমন সুযোগ চাইলে তাঁকে সহযোগিতা করতে পারি।
টিপু ভাইয়ের মেধা ও যোগ্যতা সম্পর্কে আমার আগে থেকেই ধারণা ছিল। তিনি আইবিএ থেকে এমবিএ করেছিলেন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিষয়েও তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল। আমার জন্য বিষয়টি ছিল অনেকটা সাপে বর পাওয়ার মতো। একদিকে আমার একঝাঁক মেধাবী বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় ও যোগাযোগ, যাঁদের মধ্যে পাভেল, রাজি ও মনিরের মতো অ্যাকাউন্টিংয়ে দক্ষ বন্ধুরাও ছিল; অন্যদিকে টিপু ভাইয়ের সহযোগিতা। ফলে আমার এমবিএ শেষ করার পথে আর বাধা কোথায়!
এরই মধ্যে একদিন টিপু ভাইয়ের জরুরি তলব—
“ওই ভাইডি কই তুমি?”
আমি বললাম, “বিশ্ববিদ্যালয়ে।”
তিনি জানতে চাইলেন, সময় থাকলে বনানীতে যেতে পারব কি না। টিপু ভাইয়ের কথার ধরনই ছিল এমন—সরাসরি, আন্তরিক এবং আপনজনের মতো।
বিকেল চারটার দিকে নির্ধারিত ঠিকানায় পৌঁছে লিফটের নয় নম্বর বোতাম চাপলাম। গিয়ে দেখি, টিপু ভাই একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মহিউদ্দিন হেলাল ভাইয়ের সঙ্গে বসে কাচ্চি বিরিয়ানি খাচ্ছেন। পর্যটনশিল্পে হেলাল ভাইয়ের অবস্থান ও অভিজ্ঞতা ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁকে রসিকতা করে পর্যটনশিল্পের মহিরুহ কিংবা দশমাথাওয়ালা রাবণ বললেও খুব একটা বাড়িয়ে বলা হবে না!
আমাকে দেখেই তিনি তাঁর চেম্বারে ডেকে বললেন, “আগে হাত ধুয়ে আসো, খেয়ে নাও। বুঝতে পারছি, খাওয়া হয়নি।”
সত্যি বলতে, তখন আমার পেটেও বেশ ক্ষুধা ছিল। খাওয়া শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচিত হলাম মহিউদ্দিন হেলাল ভাইয়ের সঙ্গে।
তিনি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পর্যটন গন্তব্য নিয়ে আউটবাউন্ড ও ইনবাউন্ড ট্যুর পরিচালনা করতেন। পাশাপাশি একটি সাপ্তাহিক ও একটি মাসিক ট্রাভেল ম্যাগাজিনের সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন।
আমি যেহেতু একটি বড় বিজ্ঞাপনী সংস্থায় দীর্ঘদিন কাজ করেছি, তাই আমার অভিজ্ঞতার কথা শুনে তিনি আমাকে আমার শর্ত অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ দিলেন। আমিও আনন্দের সঙ্গে কাজ শুরু করলাম।
এই কাজের সুবাদে পর্যটনশিল্প সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ পেলাম। শিল্পটির বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয়, বিপণন কৌশল, পর্যটকের মনস্তত্ত্ব, গন্তব্যের প্রচার এবং পর্যটনপণ্যের বাজারজাতকরণ সম্পর্কে হাতে-কলমে শিখলাম। হেলাল ভাই আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন বিষয় শেখাতেন। পরবর্তী সময়ে আমার পেশাগত জীবনে সেই অভিজ্ঞতা অনেক কাজে এসেছে।
আজ এত পুরোনো একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলার পেছনে একটি নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।
প্রতিটি কাজের নিজস্ব কিছু কৌশল, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আছে। যে যার কাজের জায়গায় দক্ষতা অর্জন করবেন, অন্যের কাজের ক্ষেত্রকে সম্মান করবেন—তাহলেই বিভ্রান্তি কমবে, কাজের মান বাড়বে।
দক্ষতা আর অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্য আছে,
ধরা যাক, একজন চিকিৎসক এমবিবিএস শেষ করে কান, নাক কিংবা গলার চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি সেই নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতেই পারেন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, মানবদেহের অন্য সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পর্কেও তাঁর সমান বিশেষজ্ঞ জ্ঞান রয়েছে।
একইভাবে, আমি বিপণন বা বাস্তবায়নের কাজে দক্ষ হতে পারি। কোনো পণ্যের প্রচার, প্রসার কিংবা সৃজনশীল যোগাযোগের উপাদান তৈরিতে আমার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সেই পণ্যটি কখন, কীভাবে, কোন শ্রেণির ক্রেতার কাছে এবং কী কৌশলে বিক্রি হবে—সেসব বিষয়ে পণ্যের উৎপাদক, বাজারবিশ্লেষক কিংবা সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
একজন বিজ্ঞাপন ও যোগাযোগকর্মী হিসেবে আমার কাজ পণ্যের গুণাগুণকে মানুষের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা। কিন্তু পণ্যের প্রকৃত বাজার, ক্রেতার চাহিদা, বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক ফলাফল বুঝতে হলে সংশ্লিষ্ট শিল্পের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও তথ্যের প্রয়োজন হয়।
অতএব, একটি শিল্পের প্রচার-প্রচারণা এবং সেই শিল্পের সামগ্রিক উন্নয়ন—দুটি সম্পর্কিত হলেও এক বিষয় নয়।
এই সহজ সত্যটি না বুঝলে আমরা অনেক সময় আয়োজনকে সফল মনে করি, অথচ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হলো, সেই প্রশ্নটি আর তুলি না।
বিচ কার্নিভাল ২০২৬: আয়োজনের সাফল্য, নাকি পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন?
শোনা যাচ্ছে, বিচ কার্নিভাল ২০২৬-এর আয়োজক বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। তবে এই আয়োজনের নীতিনির্ধারণী ও পরিকল্পনাপ্রক্রিয়ায় যিনি মূল ভূমিকা রেখেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তিনি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার।
ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁকে চিনি না। আমার পেশাগত জীবনের প্রায় ২৫ বছরের অভিজ্ঞতায় বিজ্ঞাপন সংস্থা সহ বড় বড় ইভেন্টে আয়োজক কোম্পানির সাথে কাজ করা সুযোগ হয়েছে,যার মধ্যে প্রায় চার বছর দেশী পর্যটনশিল্প ও টুরিজম মালয়শিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলাম, যাঁদের চলাচল ও কাজের পরিধি দেখেছি, তাঁদের কাছে ঐ চলচিত্র নির্মাতাতার নামটি তুলনামূলকভাবে নতুন। পর্যটনশিল্পে আমার পরিচিত অনেকের কাছেও এই আয়োজনের পরিকল্পনা ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল না বলে শুনতেছি।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—কোনো ব্যক্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা কিংবা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হলেই তিনি পর্যটনশিল্পের কোনো বড় আয়োজনের পরিকল্পনা বা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন না, এমন কথা আমি বলছি না। বরং প্রশ্নটি হলো, এত বড় একটি রাষ্ট্রীয় পর্যটন আয়োজনের পরিকল্পনা কীভাবে করা হয়েছে, কারা এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এর পেছনে পর্যটনশিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিয়ে কী ধরনের চিন্তাভাবনা কাজ করেছে?
পর্যটনশিল্পের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত পেশাজীবী, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশ যদি এমন আয়োজনের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত না থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—পরিকল্পনা ও অংশীজনদের সম্পৃক্ততার প্রক্রিয়াটি কতটা বিস্তৃত ছিল?
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পাশাপাশি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডও দেশের পর্যটন উন্নয়নে কাজ করে। এমন একটি বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কতটা সমন্বয় ছিল, সেটিও জানার বিষয়।
দেশের পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে বেসরকারি খাতের বহু প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। অনেকে ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করেছেন, আবার অনেকে নতুন করে বিনিয়োগের সম্ভাবনা খুঁজছেন। তাঁদের পরিকল্পনার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সমন্বয় ঘটানো গেলে এমন আয়োজন আরও কার্যকর হতে পারত।
এখানে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—এটি কি কেবল একটি উৎসব আয়োজনের উদ্যোগ ছিল, নাকি কুয়াকাটাকে দেশি-বিদেশি পর্যটকের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ?
আর যদি এটি দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন উন্নয়নের পরিকল্পনার অংশ হয়ে থাকে, তাহলে সেই পরিকল্পনার দৃশ্যমান রূপরেখা কোথায়?
স্পনসরশিপের সাফল্যই কি পর্যটনের সাফল্য?
দেখা গেছে, একটি প্রসাধনী প্রতিষ্ঠান এই আয়োজনের টাইটেল স্পনসর হিসেবে যুক্ত ছিল। স্পনসর প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি যথেষ্ট যৌক্তিক। বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমে নিজেদের পণ্য ও ব্র্যান্ডকে পরিচিত করার সুযোগ তারা পেয়েছে। ব্র্যান্ডের প্রচার ও পরিচিতি বৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণে এ ধরনের আয়োজন কার্যকর হতে পারে।
কিন্তু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিংয়ের সাফল্য এবং একটি পর্যটন গন্তব্যের উন্নয়ন—দুটিকে একই মানদণ্ডে বিচার করা যায় না।
স্পনসর প্রতিষ্ঠান কত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে, কতটা প্রচার পেয়েছে কিংবা মানুষের মনে ব্র্যান্ডের পরিচিতি কতটা বেড়েছে—এসবের হিসাব তাদের নিজস্ব বিপণন কৌশলের অংশ।
অন্যদিকে, পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন আলাদা কিছু সূচক।
যেমন—
১. পর্যটক আকর্ষণ: এই আয়োজনের ফলে কুয়াকাটায় দেশি ও বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা কতটা বেড়েছে?
২. আন্তর্জাতিক পরিচিতি: বিদেশি পর্যটক, ট্যুর অপারেটর ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণবিষয়ক গণমাধ্যমের কাছে কুয়াকাটার পরিচিতি কতটা বিস্তৃত হয়েছে?
৩. বিনিয়োগের সম্ভাবনা: আয়োজনের পর দেশি-বিদেশি নতুন বিনিয়োগকারী বা পর্যটন উদ্যোক্তারা কুয়াকাটায় বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন কি?
৪. স্থানীয় অর্থনীতি: স্থানীয় হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট সেবাদানকারীরা কতটা উপকৃত হয়েছেন?
৫. স্থানীয় অংশগ্রহণ: স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পী, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততা কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে?
৬. দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: আয়োজন শেষে কুয়াকাটার পর্যটনশিল্পে কী ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন প্রত্যাশা করা হচ্ছে এবং তা পরিমাপের ব্যবস্থা কী?
৭. ফলোআপ পরিকল্পনা: আয়োজনের পর পর্যটক আকর্ষণ, বিপণন, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া কেবল মানুষের সমাগম, মঞ্চের জাঁকজমক কিংবা স্পনসরদের ব্র্যান্ডিং দেখে পর্যটন উন্নয়নের সাফল্য নির্ধারণ করা কঠিন।
প্রচার ছিল, কিন্তু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কোথায়?
এ ধরনের একটি বড় আয়োজনের পর গণমাধ্যমে তার প্রতিফলনও গুরুত্বপূর্ণ। আমি যতটুকু দেখেছি, কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল ও কিছু ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আয়োজনটি নিয়ে সীমিত পরিসরে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তবে আয়োজনের ব্যাপকতা বিবেচনায় জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রত্যাশিত মাত্রায় সংবাদ ও বিশ্লেষণ আমার চোখে পড়েনি।
এখানে প্রশ্নটি শুধু সংবাদ প্রকাশের নয়। একটি বড় পর্যটন আয়োজনের সংবাদমূল্য নির্ভর করে তার অভিনবত্ব, প্রভাব, অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর। তাই আয়োজনের আগে, চলাকালে ও পরে পরিকল্পিত গণমাধ্যম যোগাযোগ থাকলে এর প্রচার আরও বিস্তৃত হতে পারত।
আরও একটি বিষয় আমাকে ভাবিয়েছে—স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী ও শিল্পীদের অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে? কুয়াকাটার মতো একটি পর্যটন গন্তব্যের পরিচিতি তৈরিতে স্থানীয় সংস্কৃতি, সংগীত, লোকজ ঐতিহ্য ও শিল্পচর্চার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অথচ স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের যথাযথ সম্পৃক্ততা নিশ্চিত না হলে এমন আয়োজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অপূর্ণ থেকে যেতে পারে।
একটি সফল পর্যটন আয়োজন শুধু দর্শনার্থীদের বিনোদন দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি স্থানীয় সংস্কৃতিকে তুলে ধরবে, স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং পর্যটন গন্তব্যটির দীর্ঘমেয়াদি পরিচিতি গড়ে তুলবে—এটাই প্রত্যাশিত।
এমন একটি আয়োজনের সঙ্গে পর্যটনশিল্পের উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের নিয়ে সেমিনার, বি-টু-বি বৈঠক কিংবা গোলটেবিল আলোচনা আয়োজন করা গেলে আরও কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব ছিল। এসব আয়োজনের মাধ্যমে নতুন ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরি হতে পারত, বিনিয়োগের সম্ভাবনা চিহ্নিত করা যেত এবং কুয়াকাটার পর্যটন উন্নয়নে একটি সমন্বিত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নের সুযোগ তৈরি হতো।
কুয়াকাটাকে আগামী দিনে কোথায় নিয়ে যেতে চাই, আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে এর অবস্থান কীভাবে শক্তিশালী করা যায়, কোন ধরনের পর্যটককে লক্ষ্য করে প্রচারণা চালানো উচিত, কী ধরনের অবকাঠামো ও সেবা উন্নয়ন প্রয়োজন—এসব বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ভিশন থাকা জরুরি।
কিন্তু এই আয়োজনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, উন্নয়ন-দর্শন কিংবা পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে আমার চোখে পড়ার মতো কোনো সুস্পষ্ট তথ্য আসেনি।
অবশ্যই, আমার চোখে পড়েনি মানেই এমন কোনো পরিকল্পনা নেই—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তবে পরিকল্পনা থাকলে সেটি সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরাও গুরুত্বপূর্ণ।
আয়োজন সুন্দর হলেই কি উদ্দেশ্য সফল হয়?
সব সমালোচনার পরও একটি কথা স্বীকার করতে হবে—বিচ কার্নিভাল ২০২৬ একটি সুন্দর ও উপভোগ্য বিনোদনমূলক আয়োজন হয়ে থাকলে তার কৃতিত্ব সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের প্রাপ্য। এমন আয়োজন বাস্তবায়নে পরিকল্পনা, অর্থ, শ্রম, সময় ও সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়। তাই আয়োজনের ইতিবাচক দিকগুলো অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই।
কিন্তু আমার প্রশ্নটি আয়োজনের সৌন্দর্য নিয়ে নয়; বরং এর সামগ্রিক তাৎপর্য নিয়ে।
আমরা কি শুধু দেখাতে চাই যে, আমরা একটি বড় আয়োজন করতে পারি? নাকি এমন আয়োজনের মধ্য দিয়ে পর্যটনশিল্পের বাস্তব উন্নয়ন ঘটাতে চাই?
আমরা কি শুধু একটি উৎসব সফলভাবে সম্পন্ন করার আনন্দে আত্মতৃপ্ত থাকব? নাকি এর ফলাফল বিশ্লেষণ করে পরবর্তী আয়োজনকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা করব?
আমরা কি শুধু দর্শনার্থীদের ভিড় ও ব্র্যান্ডের প্রচারকে সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করব? নাকি নতুন বিনিয়োগ, স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন সম্ভাবনাকেও সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে ধরব?
একটি আয়োজনের সাফল্য শুধু তার উদ্বোধন, মঞ্চ, আলোকসজ্জা কিংবা সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর প্রকৃত সাফল্য বোঝা যায় আয়োজন শেষ হওয়ার পর—যখন তার ইতিবাচক প্রভাব সংশ্লিষ্ট শিল্প, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও অর্থনীতিতে দৃশ্যমান হতে শুরু করে।
পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু আয়োজন করলেই হবে না; আয়োজনের উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা, অংশীজনদের সম্পৃক্ততা, বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী কার্যক্রম—সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে।
একজন বিজ্ঞাপন ও যোগাযোগকর্মী হিসেবে আমি জানি, একটি ভালো আয়োজন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। কিন্তু সেই মনোযোগকে দীর্ঘমেয়াদি আগ্রহে রূপান্তর করতে হলে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর যোগাযোগ, তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন এবং ধারাবাহিক উদ্যোগ।
আমার প্রশ্ন তাই খুব সরল—
বিচ কার্নিভাল ২০২৬ কি শুধু একটি আয়োজনের সাফল্য, নাকি কুয়াকাটার পর্যটনশিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটি কার্যকর পদক্ষেপ?
আয়োজনের পর পর্যটকসংখ্যা, বিনিয়োগের আগ্রহ, স্থানীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক প্রচার এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার তথ্য প্রকাশ করা হলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া সহজ হবে।
কারণ, কোনো কিছু করে দেখানো আর সেই কাজের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন সৃষ্টি করা এক বিষয় নয়।
আমাদের প্রয়োজন শুধু আয়োজনের সাফল্য উদ্যাপন নয়; প্রয়োজন সেই সাফল্যের স্থায়ী সুফল নিশ্চিত করা।