সরকারি চাকরিতে কর্মরত একজন কর্মচারীর জমি কেনা এবং বহুতল ভবন নির্মাণে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের তথ্য সামনে এসেছে। সাইফুল সার্ভেয়ার নামের ওই কর্মচারী বরিশাল নগরের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে ছয় শতাংশ জমি কিনেছেন। সেখানে পাঁচতলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। জমি কেনা ও নিবন্ধনের ব্যয় এবং ভবন নির্মাণের সম্ভাব্য খরচ যোগ করলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ কোটি ৬৫ লাখ ৮২ হাজার টাকার বেশি।
সাইফুল সার্ভেয়ারের দাবি, নিজের পরিশ্রমের উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি জমি কিনেছেন এবং ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে তাঁর চাকরির প্রকৃত মেয়াদ, এ পর্যন্ত পাওয়া বেতন-ভাতা, সঞ্চয়, অন্য কোনো বৈধ আয়ের উৎস এবং বিনিয়োগের অর্থের বিস্তারিত হিসাব যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে তাঁর আয় ও সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই।
জনস্বার্থে এখন প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি চাকরির আয় ও দীর্ঘদিনের সঞ্চয় থেকে এত বড় বিনিয়োগ করা সম্ভব হয়েছে কি না। এ প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন সম্পদের দলিল, নির্মাণব্যয়ের হিসাব, আয়কর নথি, চাকরির আয়-সংক্রান্ত তথ্য এবং অর্থের উৎসের যথাযথ যাচাই।
সম্প্রতি বরিশাল নগরের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে জমির দখল নিয়ে সাইফুল সার্ভেয়ার ও তাঁর এক প্রতিবেশীর মধ্যে বিরোধের ঘটনা ঘটে। গত বৃহস্পতিবার এ ঘটনার একটি ভিডিও তালাশ বিডিতে প্রকাশ করা হয়। ভিডিওটি প্রকাশের পর সাইফুল সার্ভেয়ারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তাঁর বক্তব্য নেওয়া হয়।
সাইফুল সার্ভেয়ার জানান, গত বছর তিনি নিজের নামে ছয় শতাংশ জমি কিনেছেন। প্রতি শতাংশ জমির দাম দিয়েছেন ১৭ লাখ টাকা। সে হিসাবে জমির ক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ১ কোটি ২ লাখ টাকা। জমি নিবন্ধন করতে তাঁর ব্যয় হয়েছে আরও ১৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা।
এই হিসাব অনুযায়ী, জমি কেনা ও নিবন্ধন মিলিয়ে তাঁর মোট ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা।
জমিটির অবস্থান, দলিলের বিবরণ, নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি এবং অর্থ পরিশোধের প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এসব নথি পর্যালোচনা করা গেলে জমি কেনার প্রকৃত ব্যয় সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।
জমিটি কেনার পর সেখানে পাঁচতলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন সাইফুল সার্ভেয়ার। ভবন নির্মাণের জন্য বরিশাল সিটি করপোরেশন থেকে অনুমোদিত নকশা নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
সাইফুলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভবন নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন নির্মাণব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভবন নির্মাণে প্রতি বর্গফুটে আনুমানিক ২ হাজার ৮৫০ থেকে ৩ হাজার ৭৫০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। তবে ভবনের ধরন, অবস্থান, নির্মাণসামগ্রীর মান ও নকশাভেদে এ ব্যয় কমবেশি হয়।
পাঁচতলা ভবনের ক্ষেত্রে জমির মাটি পরীক্ষা, পাইলিং, ভিত্তি নির্মাণ, রড, সিমেন্ট, ইট, বালু, শ্রমিকের মজুরি, বৈদ্যুতিক সংযোগ, পানির ব্যবস্থা এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। তাই কেবল সাধারণ বাজারদরের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট ভবনটির প্রকৃত নির্মাণব্যয় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
সাইফুল সার্ভেয়ারের দেওয়া তথ্য এবং ভবন নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয় ধরে বিনিয়োগের প্রাথমিক হিসাব দাঁড়াচ্ছে এ রকম,
• ছয় শতাংশ জমির ক্রয়মূল্য: ১ কোটি ২ লাখ টাকা।
• জমি নিবন্ধনের ব্যয়: ১৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা।
• জমি কেনা ও নিবন্ধনে মোট ব্যয়: ১ কোটি ১৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা।
• পাঁচতলা ভবন নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয়: সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি।
• জমি কেনা, নিবন্ধন ও ভবন নির্মাণ মিলিয়ে সম্ভাব্য মোট বিনিয়োগ: ৪ কোটি ৬৫ লাখ ৮২ হাজার টাকার বেশি।
এ হিসাবের বাইরে নকশা অনুমোদন, মাটি পরীক্ষা, ড্রিলিং বা পাইলিং, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় হতে পারে। তবে এসব খাতে প্রকৃত ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি।
ফলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৪ কোটি ৬৫ লাখ ৮২ হাজার টাকার বেশি হতে পারে বলে প্রাথমিক হিসাব থেকে ধারণা পাওয়া গেছে।
সরকারি কর্মচারীদের আয় ও সম্পদের সামঞ্জস্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে চাকরির মেয়াদ, মূল বেতন, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, প্রাপ্য ভাতা, অন্যান্য বৈধ আয়, পারিবারিক সম্পদ এবং ঋণের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
উদাহরণ হিসেবে, একজন কর্মচারীর মাসিক বেতন-ভাতা গড়ে ৩০ হাজার টাকা ধরে হিসাব করলে বছরে মোট আয় হয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ হিসাবে ২০ বছরে মোট আয় দাঁড়ায় ৭২ লাখ টাকা।
তবে এই হিসাবটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক একটি উদাহরণ। সাইফুল সার্ভেয়ারের প্রকৃত বেতন-ভাতা, চাকরির মেয়াদ কিংবা অন্যান্য আয়ের তথ্যের ভিত্তিতে এটি তৈরি করা হয়নি। তাঁর চাকরিজীবনের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত আয়ও একই ছিল—এমন ধরে নেওয়া যায় না। বেতন বৃদ্ধি, প্রাপ্য ভাতা, বৈধ অতিরিক্ত আয় এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার কারণে প্রকৃত মোট আয় ভিন্ন হতে পারে।
অন্যদিকে, একজন কর্মচারীর মোট আয়ই তাঁর সঞ্চয় নয়। নিজের ও পরিবারের ভরণপোষণ, স্ত্রী-সন্তানের ব্যয়, মা-বাবার দেখাশোনা, সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর কত টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব, সেটিও হিসাব করতে হবে।
আবার পারিবারিক সম্পদ, উত্তরাধিকার, বৈধ ব্যবসা, ব্যাংকঋণ কিংবা অন্য কোনো বৈধ আর্থিক উৎস থাকলে তা বিনিয়োগের সক্ষমতায় ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই কেবল তাঁর সরকারি চাকরির গ্রেডের ভিত্তিতে বিনিয়োগের অর্থ অবৈধ বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন ঠিক হবে না, তেমনি অর্থের উৎস যাচাই না করে সব বিনিয়োগকে চাকরির আয় ও সঞ্চয়ের ফল বলেও ধরে নেওয়া যায় না।
একটি সূত্রের দাবি, সাইফুল সার্ভেয়ার বর্তমানে পিরোজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি শাখায় কর্মরত রয়েছেন। তবে তাঁর বর্তমান কর্মস্থল, পদবি, বেতন-গ্রেড এবং চাকরির মেয়াদসংক্রান্ত তথ্য জানা সম্ভব হয়নি।
সরকারি চাকরিতে কর্মরত ব্যক্তির সম্পদ ও আয়ের সামঞ্জস্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের চাকরির নথি গুরুত্বপূর্ণ। চাকরিতে যোগদানের তারিখ, পদোন্নতি, বেতন নির্ধারণ, ভাতা এবং অন্যান্য বৈধ আর্থিক সুবিধার তথ্য পাওয়া গেলে তাঁর সম্ভাব্য মোট আয় সম্পর্কে একটি বাস্তবসম্মত ধারণা তৈরি করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে সম্পদ অর্জনের সময়কাল এবং অর্থ পরিশোধের উৎসের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নথির ভিত্তিতে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সাইফুল সার্ভেয়ার জানিয়েছেন, নিজের পরিশ্রমের উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি জমি কিনেছেন এবং ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন।
সাইফুল সার্ভেয়ারের জমি কেনা ও ভবন নির্মাণে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের বিষয়টি সামনে আসার পর দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে অভিযোগ দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
এ বিষয়ে বরিশাল জেলা দুর্নীতি দমন কমিশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হলে তা যথাযথভাবে যাচাই করে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
সরকারি চাকরিতে থেকে বৈধ উপার্জন, সঞ্চয় কিংবা অন্য কোনো বৈধ উৎসের অর্থে জমি কেনা ও ভবন নির্মাণ করা আইনত অপরাধ নয়। তবে কোনো সরকারি কর্মচারীর বিনিয়োগের পরিমাণ তাঁর ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে যুক্তিসংগত প্রশ্ন উঠলে বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করা জনস্বার্থের অংশ।
সাইফুল সার্ভেয়ারের ক্ষেত্রে প্রথমত তাঁর চাকরির মেয়াদ ও আয়সংক্রান্ত তথ্য, দ্বিতীয়ত জমির দলিল ও নিবন্ধন ব্যয়ের নথি, তৃতীয়ত ভবন নির্মাণের অনুমোদিত নকশা ও প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব এবং চতুর্থত বিনিয়োগের অর্থের উৎস যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর দাখিল করা সম্পদবিবরণী ও আয়কর নথি আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করা গেলে আয় ও সম্পদের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
প্রাথমিক হিসাবে জমি কেনা, নিবন্ধন ও ভবন নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ৪ কোটি ৬৫ লাখ ৮২ হাজার টাকার বেশি। কিন্তু এই অর্থের প্রকৃত উৎস কী, বিনিয়োগের সঙ্গে তাঁর বৈধ আয় ও সঞ্চয়ের সামঞ্জস্য কতটা এবং অন্য কোনো বৈধ আর্থিক উৎস রয়েছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।