বরিশাল নগরের আমানতগঞ্জ, আবহাওয়া অফিস সংলগ্ন এলাকা ও পোর্ট রোডে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে কয়েকটি হানিট্র্যাপ চক্র। প্রলোভন, প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে এসব চক্রের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীরা সামাজিক লজ্জার কারণে মুখ না খুলে থাকায় চক্রগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নগরের পুরাতন বাণিজ্য এলাকা আমানতগঞ্জে সন্ধ্যার পর কয়েকটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিতি তৈরি করে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী বা অচেনা যুবকদের দেখা করার প্রলোভনে ডেকে আনা হয়। পরে আগে থেকে ওত পেতে থাকা সদস্যরা ঘরের ভেতর বা নির্জন জায়গায় ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করে।
আবহাওয়া অফিস সংলগ্ন এলাকা রাতের নির্জনতার কারণে চক্রগুলোর আরেকটি নিরাপদ জায়গায় পরিণত হয়েছে। এখানে নারী সদস্যের মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে ডেকে এনে ‘সিচুয়েশন’ তৈরি করা হয়। পরে চক্রের পুরুষ সদস্যরা এসে বলে— “সব রেকর্ড হয়েছে”—এ কথা বলে নগদ অর্থ বা বিকাশ-নগদের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেয়।
পোর্ট রোড—সবচেয়ে সংগঠিত চক্রের কেন্দ্রস্থল তাই নগরের পোর্ট রোডকে ঘিরে সবচেয়ে সংগঠিত হানিট্র্যাপ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এলাকার কয়েকটি আবাসিক হোটেলে অসাধু কর্মীদের সহযোগিতায় চক্রগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নারী সদস্যরা অতিথি পরিচয়ে রুমে ঢোকে এবং ভুক্তভোগীকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় নিয়ে আসার পর বাহিরে অবস্থানরত পুরুষ সদস্যরা জোরপূর্বক ঢুকে পড়ে। এরপর ভিডিও ধারণের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করা হয়।
এক ভুক্তভোগী জানান, রুমে ঢোকার কিছুক্ষণ পরেই তিনজন ঢুকে বলে—সব রেকর্ড আছে, এখনই টাকা দিতে হবে।
তদন্তে জানা গেছে, এসব চক্রে জড়িত রয়েছে, কিছু অসাধু হোটেল কর্মী, সোশ্যাল মিডিয়া প্রতারক, নারী সদস্য, পেশাদার চাঁদাবাজ, কয়েকজন তথাকথিত অনলাইন রিপোর্টার।
চক্রগুলো নিজেদের মধ্যে সমন্বিত এবং নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন করে কাজ চালায়।
টার্গেটে করে মূলত ব্যবসায়ী-চাকরিজীবীদেরকেই। ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ পরিচিতির মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি করাই চক্রের প্রধান পদ্ধতি। নারী সদস্যরা সহজ-সরল মানুষকে লক্ষ্য করে দেখা করার প্রস্তাব দেয়। দেখা করতে গেলে ফাঁদে পড়ে বিপদে পড়েন ভুক্তভোগীরা।
সামাজিক লজ্জা, পরিবারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ভয়ে ভুক্তভোগীরা মামলা করতে সাহস পান না—আর এই নীরবতার সুযোগই নেয় অপরাধীরা।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযোগ মৌখিকভাবে পাওয়া যায়, কিন্তু ভুক্তভোগীরা পরিচয় প্রকাশ করতে না চাওয়ায় তদন্তে বাধা সৃষ্টি হয়। তবুও আমরা চক্রগুলোর ওপর নজরদারি বাড়িয়েছি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের দাবি ও নগরবাসীর দাবি, হানিট্র্যাপ চক্রের কারণে পুরো নগরে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
তাদের মতে—হোটেলগুলোতে মনিটরিং বৃদ্ধি, হটস্পটে সিসিটিভি স্থাপন, রাতের টহল জোরদার, সাইবার ক্রাইম ইউনিটের অভিযান, চক্র নির্মূলে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বরিশালের আমানতগঞ্জ, আবহাওয়া অফিস ও পোর্ট রোড এলাকায় হানিট্র্যাপ চক্রের দৌরাত্ম্য দিন দিন বাড়ছে। এই চক্র শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, মানুষের সম্মান ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
ভুক্তভোগীদের নীরবতা ও সামাজিক লজ্জা চক্রগুলোকে আরও শক্তিশালী করছে।
নগরবাসী আশা করছে—দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অভিযান চালিয়ে এই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনবে।