পিপিআরের বাইরে শর্ত আরোপ ও পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ; লিখিত আবেদন গ্রহণে অনীহার অভিযোগ সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে
নিজস্ব প্রতিবেদক :
সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিধান থাকলেও বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি কেনার দরপত্রে তিনটি শর্ত নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালার (পিপিআর) বাইরে শর্ত আরোপ করে নতুন উদ্যোক্তা ও সাধারণ ঠিকাদারদের অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দরপত্রের বাজারদরের তালিকা দেখতে না দেওয়া, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারসাজি এবং পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
অভিযোগের তীর বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. মো. সাইয়েদুর রহমানসহ দরপত্র মূল্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যদের দিকে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইতে গেলে তাঁরা সন্তোষজনক উত্তর পাননি। এমনকি লিখিত অভিযোগ দিতে চাইলেও তা গ্রহণ না করে অনলাইনে অভিযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।
তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দরপত্রের পূর্ণাঙ্গ নথি যাচাই ছাড়া অনিয়ম বা বিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি কেনার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে ই-টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে ২৯ অক্টোবর।
দরপত্রের শর্তাবলিতে তিনটি বিষয় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন সম্ভাব্য দরদাতারা।
প্রথমত, দরপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ইমেইলে কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়’।
দ্বিতীয়ত, দরদাতাকে আগে পণ্য আমদানি করেছেন, এমন প্রমাণ হিসেবে তিনটি আমদানি বিল জমা দেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ঠিকাদাররা।
তৃতীয়ত, চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পাসবই জমা দেওয়ার শর্ত রাখা হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
অভিযোগকারী ঠিকাদারদের প্রশ্ন, চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের সক্ষমতা, পণ্যের মান, আর্থিক সামর্থ্য ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি এসব শর্ত আরোপের বিধিগত ভিত্তি কী? বিশেষ করে, সরাসরি আমদানির অভিজ্ঞতা না থাকলেও অনুমোদিত আমদানিকারক বা বৈধ সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে মানসম্মত চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে সক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন এমন শর্তের মুখোমুখি হতে হবে?
তাঁদের আশঙ্কা, এসব শর্তের কারণে নতুন উদ্যোক্তা ও সাধারণ ঠিকাদারদের একটি অংশ দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ হারাতে পারেন। এতে প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়ার পাশাপাশি দরপত্রের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
দরপত্রের শর্ত নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি বাজারদরের তালিকা দেখতে না দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন সাধারণ ঠিকাদাররা।
তাঁদের দাবি, দরপত্রের বাজারদরের তালিকা দেখতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাঁদের সন্তোষজনক তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। বরং বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, বাজারদরের তালিকা গায়েব করে ফেলা হয়েছে। তবে তালিকাটি সত্যিই গায়েব করা হয়েছে কি না, নাকি অন্য কোনো কারণে তা দেখানো সম্ভব হয়নি, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বিষয়ে তদন্ত প্রয়োজন।
সরকারি অর্থে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে পণ্যের বাজারদর, দরপত্রের মূল্যায়ন এবং ক্রয়প্রক্রিয়ার নথিপত্রের স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাজারদরের তালিকা নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছেন ঠিকাদাররা।
দরপত্র প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কমিটির সঙ্গে ডা. আশিক, ডা. রেহেনা ফেরদাউস ও ডা. বলাই কৃষ্ণ বড়াল সংশ্লিষ্ট রয়েছেন।
অভিযোগকারী ঠিকাদারদের দাবি, দরপত্রের শর্ত নির্ধারণ, বাজারদরের তালিকা প্রদর্শন এবং দরদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। তাঁদের আরও অভিযোগ, নির্দিষ্ট একটি পক্ষকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে দরপত্রের শর্ত সাজানো হয়ে থাকতে পারে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে শর্ত আরোপ করা হয়েছে কি না, তা প্রমাণের জন্য দরপত্রের নথি, শর্ত নির্ধারণের যৌক্তিকতা, মূল্যায়নপদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
দরপত্রের শর্ত পুনর্বিবেচনা এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতে সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে লিখিত আবেদন করতে চেয়েছে মেসার্স মর্ডান স্কয়ার নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সাব্বির হোসেনের দাবি, সরকারি গেজেট ও ক্রয়বিধিমালার আলোকে নতুন প্রতিষ্ঠান এবং উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের দরপত্রে আরোপিত কিছু শর্ত সাধারণ ঠিকাদারদের অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, “সরকারি গেজেটে নতুন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ থাকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের দরপত্রে এমন কঠিন কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ ঠিকাদারদের অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে। আমরা মনে করছি, পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এসব শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।”
সাব্বির হোসেনের অভিযোগ, এ বিষয়ে সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে চাইলে তাঁকে অনলাইনে অভিযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। লিখিত অভিযোগ গ্রহণে সিভিল সার্জন অনীহা প্রকাশ করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. মো. সাইয়েদুর রহমানের বক্তব্য, বিশেষ কাউকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে দরপত্রে কোনো শর্ত আরোপ করা হয়নি। তাঁর দাবি, দরপত্রের শর্তগুলো পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালার আওতাভুক্ত।
অন্যদিকে, অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁরা সংশ্লিষ্ট বিধিমালার গেজেটের কপি দেখিয়ে শর্তগুলোর ভিত্তি জানতে চাইলেও সিভিল সার্জন নির্দিষ্ট বিধি বা ধারা দেখাতে পারেননি।
দরপত্রের শর্তাবলি ও অভিযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে সিভিল সার্জন বলেন, “আমি একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হলে পুরো বিষয়টি বলতে পারব।”
তবে দরপত্রে আরোপিত তিনটি শর্তের প্রত্যেকটির বিধিগত ভিত্তি কী, সেগুলো ক্রয়যোগ্য পণ্যের জন্য কতটা প্রয়োজনীয় এবং সম্ভাব্য দরদাতাদের অংশগ্রহণে সেগুলোর প্রভাব কী, এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর পেতে সংশ্লিষ্ট দরপত্রের নথি ও প্রযোজ্য বিধিমালা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারী সাধারণ ঠিকাদাররা বলছেন, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় কোনো শর্ত আরোপ করা হলে তার যৌক্তিকতা ও বিধিগত ভিত্তি স্পষ্ট থাকা উচিত। এমন কোনো শর্ত থাকা উচিত নয়, যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে যোগ্য দরদাতাদের অংশগ্রহণ সীমিত করে।
তাঁদের দাবি, দরপত্রের শর্তগুলো পুনর্বিবেচনা, বাজারদরের তালিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্ত এবং পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বর্তমান দরপত্র বাতিল করে বিধিসম্মতভাবে নতুন করে দরপত্র আহ্বানেরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটা জনস্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ ক্ষেত্রে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, পণ্যের গুণগত মান এবং যোগ্য সরবরাহকারীদের মধ্যে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।