আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বরিশাল রাজনীতিতে আবারও সরব হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এডভোকেট মজিবুর রহমান সরোয়ার। তিনি নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন, “রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার আগে শেষবারের মতো জনগণের সেবা করার সুযোগ চাই।”
তবে রাজনৈতিক অঙ্গনের পর্যবেক্ষকরা বলছেন—দলীয় রাজনীতিতে বরিশালের মাঠে তিনি সক্রিয় থাকলেও, দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাকর্মীদের অনেকেই তার পাশে নেই। ফলে নির্বাচনী রাজনীতিতে তার অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানামুখী আলোচনা।
রাজনীতির মাঠে পুরনো যোদ্ধা সরোয়ার;
এডভোকেট মজিবুর রহমান সরোয়ার বরিশাল বিএনপির রাজনীতির এক উজ্জ্বল নাম। নব্বইয়ের দশকের গণ-আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলন—সবক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন বিএনপির অগ্রভাগে।
২০০১ সালের নির্বাচনে বরিশাল-৫ আসন থেকে তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন এবং জাতীয় সংসদে দলের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বরিশাল মহানগর বিএনপির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় রাজনীতির পালাবদলে তার চারপাশের সমীকরণ অনেকটা বদলে গেছে। বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে তার অবস্থান থাকলেও, বরিশালের স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের একাংশ তার প্রতি অনীহা প্রকাশ করছে বলে দলের ভেতরেই গুঞ্জন চলছে।
মাঠে সক্রিয়, কিন্তু দলের ভিতরে নিঃসঙ্গতা;
বরিশাল নগরীতে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় এডভোকেট সরোয়ারকে—কখনও গণসংযোগে, কখনও সামাজিক অনুষ্ঠানে, কখনও আবার রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তব্য রাখতে। তিনি বরাবরের মতোই সরকারের সমালোচনায় সরব এবং দলীয় আদর্শে অনড়।
কিন্তু বিএনপির জেলা ও মহানগর ইউনিটের একাধিক সূত্র বলছে, তার এসব কর্মসূচিতে শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। বরং যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল কিংবা ছাত্রদলের তৃণমূল পর্যায়ের কিছু নেতাকর্মীই তাকে ঘিরে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
একজন মহানগর বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
> “সরোয়ার সাহেব আমাদের অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত নেতা, কিন্তু দলের অভ্যন্তরে তার সঙ্গে অনেকের যোগাযোগ কমে গেছে। অনেকেই মনে করেন, তিনি এখন কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তেমন প্রভাবশালী নন।”
নির্বাচন ঘিরে কৌশল ও প্রত্যাশা;
সরোয়ারের ঘনিষ্ঠদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি এখন সম্পূর্ণভাবে মনোযোগ দিচ্ছেন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। তার রাজনৈতিক লক্ষ্য স্পষ্ট—“শেষবারের মতো জনগণের রায় নিয়ে সংসদে যেতে চান।”
এজন্য তিনি ধীরে ধীরে বরিশাল নগরী ও সদর উপজেলার তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। বিভিন্ন ওয়ার্ডে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করছেন, পুরনো কর্মীদের পুনরায় সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরোয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—দলীয় একতা ফিরিয়ে আনা এবং তরুণ প্রজন্মের সমর্থন অর্জন করা। কারণ বরিশালের রাজনীতিতে বর্তমানে যে প্রজন্ম নেতৃত্বে এসেছে, তারা অনেকেই সরোয়ারের রাজনৈতিক ধারা থেকে ভিন্ন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।
দলের ভেতর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিভাজন;
বরিশাল বিএনপির রাজনীতি বর্তমানে কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কিছু প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় তরুণ প্রজন্মের কিছু নেতা গড়ে উঠেছে, যারা সরোয়ারের নেতৃত্বে আস্থাশীল নয়।
এদিকে, সরোয়ার নিজেও প্রকাশ্যে একাধিকবার বলেছেন যে, “দলীয় ঐক্য ছাড়া আন্দোলন কিংবা নির্বাচনে সাফল্য আসবে না।”
এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেন,
> “সরোয়ার বরিশালের রাজনীতিতে এখনও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী। তবে দলের ভেতরের অন্তর্দ্বন্দ্ব তার পথকে কঠিন করে তুলেছে। তিনি যদি তরুণ নেতৃত্বকে পাশে নিতে না পারেন, তাহলে পরবর্তী নির্বাচনে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কঠিন হবে।”
তৃণমূলে সরোয়ারের জনপ্রিয়তা এখনো টিকে আছে;
যদিও দলীয় একাংশ তার পাশে নেই, তবুও তৃণমূল পর্যায়ে সরোয়ারের প্রতি জনগণের আস্থা এখনও বিদ্যমান। শহরের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে অনেকেই তাকে “জননেতা” হিসেবেই চেনে।
বরিশাল নগরীর এক ব্যবসায়ী বলেন,
> “সরোয়ার সাহেব সব সময় সাধারণ মানুষের পাশে থেকেছেন। দুঃসময়ে তাকে দেখা গেছে—এটাই তার বড় শক্তি।”
এছাড়া, বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের অনেকেই মনে করেন, দল যদি অভ্যন্তরীণ বিভাজন দূর করে একতাবদ্ধভাবে সরোয়ারকে সমর্থন দেয়, তবে আসন্ন নির্বাচনে তিনি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারেন।
—
সরোয়ারের দৃষ্টিতে রাজনীতি ও জনগণ;
সম্প্রতি এক বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এডভোকেট সরোয়ার বলেন,
> “আমি রাজনীতি করি মানুষের কল্যাণের জন্য, ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়। দীর্ঘ ৪০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে অনেক উত্থান-পতন দেখেছি। এখন শেষ জীবনে চাই—জনগণের রায় নিয়ে একবার শেষবারের মতো সংসদে গিয়ে বরিশালের উন্নয়নে কাজ করতে।”
তিনি আরও বলেন,
> “আমি বিশ্বাস করি, বিএনপির মূল শক্তি হচ্ছে জনগণ। তাই যদি জনগণ পাশে থাকে, তবে দলের ভেতরের কিছু মতবিরোধ বড় বিষয় নয়।”
আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য চিত্র;
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বরিশাল-৫ আসনটি আগামী নির্বাচনে বরাবরের মতোই আলোচিত আসন হতে যাচ্ছে। এখানে, বিএনপি ও অন্যান্য দলের প্রার্থী ছাড়াও কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তবে বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, তাহলে সরোয়ারের নাম প্রথম সারিতেই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এক স্থানীয় রাজনীতিবিদ বলেন,
> “সরোয়ার এখনো বরিশালে বিএনপির ‘মুখ’ হিসেবে পরিচিত। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও জনসম্পৃক্ততা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ফেরানোই এখন তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।”
শেষ রাজনীতির অধ্যায় নাকি নতুন সূচনা?
রাজনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন—এডভোকেট মজিবুর রহমান সরোয়ার কি সত্যিই শেষবারের মতো নির্বাচনে অংশ নেবেন, নাকি এটি বরিশাল বিএনপিকে নতুনভাবে ঐক্যবদ্ধ করার এক কৌশল?
তিনি নিজে অবশ্য বলছেন,
> “আমার বয়স বেড়েছে, কিন্তু মনোবল কমেনি। শেষবারের মতো যদি জনগণ সুযোগ দেয়, আমি প্রমাণ করতে চাই, রাজনীতি এখনো আদর্শের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।”
বরিশাল রাজনীতির এই প্রবীণ নেতার সামনে পথ সহজ নয়—দলীয় বিভাজন, নতুন নেতৃত্বের উত্থান এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তাকে ঘিরে আছে।
তবুও তার অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও তৃণমূলে জনপ্রিয়তা এখনো তাকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে।
রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার আগে তিনি কি শেষবারের মতো এমপি হতে পারবেন?
তার উত্তর মিলবে আগামী নির্বাচনের ভোটযুদ্ধেই।