দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে সাইবার আইনের কঠোর প্রয়োগ। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংবাদ প্রকাশ করলেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা হয়রানির অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। ফলে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরা এখন এক ধরনের অদৃশ্য চাপ ও ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা ও অতিরিক্ত ক্ষমতার কারণে গণমাধ্যম কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ বা মতামত প্রকাশ করায় সাইবার আইনের আওতায় মামলার শিকার হয়েছেন। শুধু পেশাদার সাংবাদিকই নন, অনেক ক্ষেত্রে ছাত্র, ব্লগার কিংবা সাধারণ নাগরিকও এই আইনের জটিলতায় জড়িয়ে পড়ছেন। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকরা, যারা প্রতিদিন নানা ঝুঁকি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করেন।
গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল যুগে সংবাদ প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। ফেসবুক, ইউটিউব, অনলাইন নিউজ পোর্টাল কিংবা ব্যক্তিগত ব্লগ, সবখানেই এখন সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে। কিন্তু এই প্ল্যাটফর্মগুলোতেই সবচেয়ে বেশি নজরদারি ও আইনি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফলে সংবাদ প্রকাশের আগে অনেক সাংবাদিকই এখন আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক জানান, আগে আমরা মাঠে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে সংবাদ প্রকাশ করতাম। এখন খবর প্রকাশের আগে বারবার ভাবতে হয়, এটা প্রকাশ করলে কোনো আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে কিনা। এতে সত্য প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার আইনের কিছু ধারা অত্যন্ত বিস্তৃত ও অস্পষ্ট, যার ফলে যেকোনো ব্যাখ্যায় তা প্রয়োগ করা সম্ভব। বিশেষ করে ‘মানহানি’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম’, ‘মিথ্যা তথ্য প্রচার, এসব বিষয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে বিষয়টি।
অন্যদিকে, মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই আইন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তারা মনে করেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ থাকা উচিত। কিন্তু বর্তমানে অনেক সাংবাদিক শুধুমাত্র তথ্য প্রকাশের কারণে আইনি হয়রানির শিকার হচ্ছেন, যা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য অশনিসংকেত।
দেশের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন ইতোমধ্যে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা দাবি করেছেন, সাংবাদিকদের জন্য একটি সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা জরুরি। এমন একটি আইন দরকার, যা সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় আইনি সুরক্ষা দেবে এবং অযৌক্তিক মামলা ও হয়রানি থেকে রক্ষা করবে।
একজন তরুণ সাংবাদিক বলেন, আমরা সত্য তুলে ধরতে চাই, কিন্তু এখন মনে হয় সত্য প্রকাশ করাটাই অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি ভুল ব্যাখ্যার কারণে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়ে যেতে পারে। এটা খুবই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় অনেক ছাত্রও এই আইনের আওতায় এসে পড়ছেন। তারা বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে লিখতে গিয়ে আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও এক ধরনের ভয় কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সেটি যেন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ না করে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ আইনই পারে এই দুই দিককে সমন্বয় করতে। এজন্য প্রয়োজন আইনের সংশোধন এবং স্পষ্ট গাইডলাইন প্রণয়ন।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা আরও বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করার আগে একটি স্বাধীন পর্যালোচনা বোর্ড থাকা উচিত, যা যাচাই করবে অভিযোগটি যুক্তিসঙ্গত কিনা। এতে অযথা হয়রানি কমবে এবং সাংবাদিকরা নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যম ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না।
এদিকে, অনেক সাংবাদিক মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে যদি সাংবাদিকদেরই ভয় পেতে হয়, তাহলে সত্য প্রকাশের পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
গণমাধ্যম কর্মীদের দাবি, সাইবার আইন সংশোধনের পাশাপাশি সাংবাদিকদের জন্য আলাদা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও সংবেদনশীল ও প্রশিক্ষিত করতে হবে, যাতে তারা সাংবাদিকতার স্বার্থ ও আইনের প্রয়োগের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে।
দেশজুড়ে এখন একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে, সাংবাদিকরা কি নিরাপদে কাজ করতে পারবেন? নাকি সাইবার আইনের আতঙ্কে থমকে যাবে সত্য প্রকাশের সাহস?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন সময় এসেছে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার। কারণ সাংবাদিকদের কণ্ঠ রুদ্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো সমাজ, ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণতন্ত্র। তাই সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন শুধু একটি দাবি নয়, বরং সময়ের অপরিহার্য প্রয়োজন।