স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বরিশাল কার্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শক্তিশালী দালালচক্রের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে উঠে এসেছে মোটরযান পরিদর্শক সৌরভ কুমার সাহার নাম। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মামলায় অভিযুক্ত হয়েও জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ১৯১টি অটোরিকশার অবৈধ নিবন্ধন দেওয়ার অভিযোগে সৌরভ কুমার সাহাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক। গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি পুনরায় তার পুরনো নেটওয়ার্ক সক্রিয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আমদানি ছাড়াই ২০৬টি থ্রি-হুইলার জাল কাগজে নিবন্ধনের বিষয়টিও দুদকের প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বিআরটিএ বরিশাল কার্যালয়ের লাইসেন্স, ফিটনেস ও গাড়ির নিবন্ধন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন সৌরভ। তাঁর হয়ে দালালি করেন সঞ্জীব কুমার দাস, রিয়াজ খান, আলাউদ্দীন, জাকির, আসাদুল ও হৃদয় নামে কয়েকজন। এদের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়।
২০২৫ সালের ৭ মে দুদকের অভিযানে দালাল সঞ্জীব কুমার দাসকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হলেও সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে সৌরভের নাম সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, আদায়কৃত ঘুষের প্রায় ৮০ শতাংশই নেন সৌরভ, বাকি অংশ ভাগ করে দেওয়া হয় দালালদের মধ্যে।
অভিযোগ রয়েছে, মাত্র ১১ বছরের চাকরি জীবনে সৌরভ কুমার সাহা নিজের ও আত্মীয়-স্বজনদের নামে অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ১০টি বাস, চারটি প্রাইভেট কার এবং একাধিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা। নিজ ব্যবহারের জন্য তিনি প্রায় অর্ধকোটি টাকার একটি পাজেরো গাড়িও কিনেছেন।
ফরিদপুরে তাঁর ভগ্নিপতির মাধ্যমে পরিচালিত হয় অটোরিকশা বাণিজ্য। এছাড়া “শ্রীময়ী পরিবহন” ও ঢাকা-বরিশাল রুটের “হাওলাদার পরিবহন”-এও তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সৌরভ।
দুদকের বরিশাল কার্যালয়ের উপপরিচালক রাজকুমার সাহা জানান, ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারির মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। প্রাথমিকভাবে তাঁর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। তিনি বর্তমানে জামিনে আছেন এবং আমাদের নজরদারিতে রয়েছেন।”
এর আগে একই কার্যালয়ের সাবেক সহকারী পরিচালক এমডি শাহ আলম প্রায় আড়াই হাজার গাড়ির ভুয়া নিবন্ধনের মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে যান। তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণও পেয়েছে দুদক। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সেই দুর্নীতির ধারাবাহিকতাই যেন বহন করছেন বর্তমান কর্মকর্তা সৌরভ।
অভিযোগ অস্বীকার করে সৌরভ কুমার সাহা বলেন,
“মামলায় আমি জামিনে আছি। দালালদের চিনলেও তাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।তবে বাবার নামে বাস থাকার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন।
দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার পরও কেন তাঁকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়নি—এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে। সচেতন মহল বলছে, দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নিলে বিআরটিএ বরিশাল কার্যালয় পুরোপুরি দালালচক্রের কবলে চলে যেতে পারে।
দুদকের তদন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকলেও মাঠপর্যায়ে দুর্নীতির লাগাম টানার কার্যকর উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। ফলে সাধারণ সেবা প্রত্যাশীদের ভোগান্তি বাড়ছেই-আর এরই মধ্যে ফুলে-ফেঁপে উঠছে একটি প্রভাবশালী