রিপোর্ট ; আসাদুজ্জামান মুরাদ
বরিশাল সদর উপজেলার কড়াপুর ইউনিয়নের রায়পাশা গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক মিয়াবাড়ি মসজিদ এ অঞ্চলের মুসলিম স্থাপত্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। প্রায় দুই শতাব্দী আগে, ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এই মসজিদটি আজও তার অপরূপ সৌন্দর্য ও নান্দনিক কারুকাজের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
বরিশালের হাতেম আলী কলেজের চৌমাথা থেকে মাত্র ৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মসজিদটি সহজেই যাতায়াতযোগ্য হওয়ায় প্রতিদিন স্থানীয় মুসল্লিদের পাশাপাশি দর্শনার্থীদেরও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, কড়াপুর মিয়াবাড়ি মসজিদটি মুঘল আমলের স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন মসজিদ। এটি একটি দ্বিতলবিশিষ্ট মসজিদ, যা দেশের অধিকাংশ ঐতিহ্যবাহী মসজিদের তুলনায় ব্যতিক্রমী।
মসজিদের নিচতলায় রয়েছে ছয়টি দরজাবিশিষ্ট আবাসন ব্যবস্থা, যেখানে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জন্য থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে। দোতলাকে কেন্দ্র করেই মূল মসজিদের সৌন্দর্য বহুগুণে বেড়ে গেছে। দোতলায় প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে নানান ধরনের কারুকার্যখচিত নকশা, যা মুঘল শিল্পরীতির উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
মূল মসজিদে রয়েছে তিনটি প্রধান দরজা। চারপাশে পিলারের ওপর নির্মিত হয়েছে আটটি বড় মিনার, যেগুলো মসজিদের আভিজাত্যকে আরও ফুটিয়ে তুলেছে। বড় মিনারগুলোর মাঝখানে রয়েছে ১২টি ছোট মিনি মিনার, যা পুরো স্থাপনাকে দিয়েছে এক ব্যতিক্রমী নান্দনিক রূপ। এসব মিনারের মধ্যবর্তী অংশে রয়েছে সূক্ষ্ম ও শৈল্পিক কারুকাজ, যা মসজিদটিকে করেছে অনিন্দ্যসুন্দর।
মসজিদের ছাদের ওপর রয়েছে তিনটি বড় গম্বুজ। এর মধ্যে মাঝখানের গম্বুজটি সবচেয়ে বড় ও দৃষ্টিনন্দন। গম্বুজের ভেতরের অংশে থাকা কারুকার্যময় নকশা মুসল্লিদের মনকে আধ্যাত্মিক প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে।
মসজিদ নির্মাণের পেছনে রয়েছে এক বীরত্বগাথা ইতিহাস। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে ব্রিটিশ শাসনের সূচনালগ্নে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন হায়াত মাহমুদ। তিনি ছিলেন উমেদপুরের জমিদার। তারই উদ্যোগে নির্মিত হয় এই মিয়াবাড়ি মসজিদ।
বিদ্রোহের কারণে ইংরেজ শাসকরা তাকে প্রিন্স অব ওয়েলস দ্বীপে নির্বাসিত করে এবং তার জমিদারিও কেড়ে নেয়। দীর্ঘ ১৬ বছর নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফিরে তিনি দুটি দীঘি ও এই দোতলা মসজিদ নির্মাণ করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
মসজিদের পূর্ব পাশে কয়েক একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত একটি বিশাল দীঘি মসজিদের সৌন্দর্যকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। শান্ত জলরাশির ওপর প্রতিফলিত মসজিদের ছায়া এক মনোরম দৃশ্যের সৃষ্টি করে।