স্বামীর সীমিত আয়ের সংসারে বিলাসবহুল জীবনযাপন, মেয়েকে পড়াচ্ছেন ঢাকার একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে, শহরের অভিজাত এলাকায় কোটি টাকার জমিতে গড়ে তুলেছেন তিনতলা ‘মৌটুসি প্যালেস’। অথচ সরকারি চাকুরিজীবী হিসেবেই ছিলেন তিনি—বরিশাল সিভিল সার্জন অফিসের সদ্য সাবেক হিসাব রক্ষক জাহিদা আনোয়ার মুন্নি।
তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। অভিযোগ ওঠার পর হঠাৎ করেই তিনি স্বেচ্ছায় বদলি হয়ে যোগ দেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে।
তবে নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিয়েই ২২ দিন ধরে নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন হাসপাতালের হিসাব শাখায়। যদিও তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পার্শ্ববর্তী মডেল ফ্যামিলি প্লানিং অফিসে।
সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে বরিশাল জেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকের টেন্ডার কার্যক্রম একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন জাহিদা আনোয়ার। তার ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার মরন বাবুর মালিকানাধীন “এস কে পিপলাই” নামের প্রতিষ্ঠান বিগত ১৭ বছর ধরে প্রায় সব কাজ পেয়ে এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্য ঠিকাদাররা অভিযোগ করেন, “টেন্ডারে অংশ নিলেও কোনো কাজ পাইনি। কাকতালীয়ভাবে সব কাজ গেছে মরন বাবুর পিপলাই এন্টারপ্রাইজের হাতে।”
এ নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স দীনা এন্টারপ্রাইজের মালিক সাইফুল আজম শাহিন বলেন,
> “জাহিদা আনোয়ার ও মরন বাবু মিলে সিন্ডিকেট করে টেন্ডার বাণিজ্য করতেন। যেই সিভিল সার্জন আসতেন, তাকেও ম্যানেজ করতেন তারা। এর বিনিময়ে অবৈধ সুবিধা নিয়ে মুন্নি গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদ।”
অভিযোগ রয়েছে, বরিশাল নগরীর কাউনিয়া সোবাহান মিয়ারপুল এলাকায় ‘মৌটুসি প্যালেস’ নামে তিনতলা ভবন নির্মাণ করেছেন জাহিদা আনোয়ার মুন্নি, যার বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। এছাড়াও নামে-বেনামে আরও সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি কয়েকজন ঠিকাদার স্বাস্থ্য বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দিলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে তদন্ত শুরু হয়। তদন্তের বিষয়টি টের পেয়ে তিনি তড়িঘড়ি করে স্বেচ্ছায় বদলি নেন।
৩০ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বদলির আদেশে তাকে শেবাচিম হাসপাতালে পাঠানো হয়। ৮ অক্টোবর তিনি যোগ দিলেও নিজ দায়িত্বস্থলে (মডেল ফ্যামিলি প্লানিং) একদিনও যাননি।
মডেল ফ্যামিলি প্লানিংয়ের উচ্চমান সহকারী বজলুর রহমান বলেন,
> “জাহিদা আনোয়ারের নামে দায়িত্ব দেওয়ার চিঠি পেয়েছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি একদিনও অফিসে আসেননি।”
যোগাযোগ করা হলে জাহিদা আনোয়ার দাবি করেন,
> “পরিচালক মহোদয়ের নির্দেশেই আমি হাসপাতালে কাজ করছি। আয়বহির্ভূত সম্পদের বিষয়ে আমি কিছু জানি না।”
এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোন সংযোগ কেটে দেন।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম মশিউল মুনীর বলেন,
> “তার (জাহিদা আনোয়ার) এখানে কাজের কোনো সুযোগ নেই। পদও খালি নেই, গ্রেডও মিলছে না। অনিয়ম প্রমাণিত হলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
বরিশাল জেলার সিভিল সার্জন ডা. এসএম মনজুর-এ-এলাহী বলেন,
> “তিনি স্বেচ্ছায় বদলি হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দুটি তদন্ত চলছে। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় তদন্ত করছে। দুদক এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য চায়নি, তবে চাইলেই আমরা সহযোগিতা করবো।”
বর্তমানে স্বাস্থ্য বিভাগ ও ঠিকাদার মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জাহিদা আনোয়ার মুন্নি—
এক সাবেক হিসাব রক্ষক, যিনি সরকারি চাকরিতে থেকে গড়ে তুলেছেন কোটি টাকার সাম্রাজ্য।