ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিসসহ ইসলামী মতাদর্শভিত্তিক দলগুলো সম্প্রতি বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে তাদের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম জোরদার করেছে। তবে বিগত নির্বাচনে তেমন উল্লেখযোগ্য ভোট না পেলেও, জনগণের একাংশ মনে করছে—সামাজিক কর্মকাণ্ড ও মাঠের সংগঠনে এগিয়ে থাকায় ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ইসলামী দলগুলো নতুন অবস্থান তৈরি করতে পারে। বরিশালের নাগরিকরা কি তাদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত? নাকি এখনও বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরই আস্থা বেশি?-এ নিয়েই মত বিভাজন।
বরিশাল অঞ্চলে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইসলামী দলগুলোর কর্মসূচি বেড়েছে। বিভিন্ন মানবিক সহায়তা, মিছিল, ধর্মীয় আলোচনা সভা ও সংগঠনী কার্যক্রমে মাঠে নতুন করে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। তবে বড় প্রশ্ন-ভোটে কি এই দলগুলো আস্থা পাবে?
বরিশালের সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়া বলছে, ইসলামী দলগুলো নিয়ে আগ্রহ কিছুটা বাড়লেও, রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসলামী মতাদর্শভিত্তিক দলগুলো, বাংলাদেশ জামায়াতে-ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশের নেজামে-ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি),নানা কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। তবে দেশের বিগত নির্বাচনগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব দল স্বাধীনভাবে তেমন উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে জাতীয় স্তরে সরকার গঠনে প্রত্যক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে তাদের এখনও লড়াই করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে প্রধান দুটি শক্তি-আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার পালাবদলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। তার বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ইসলামী দলগুলো ঘনঘন মাঠে নামলেও নির্বাচনী ফলাফল সবসময় তাদের অনুকূলে আসেনি। ভোটের অঙ্কে পিছিয়ে থাকলেও জনসম্পৃক্ততা, মাঠপর্যায়ের সংগঠন এবং ধর্মীয় আবেগকে ভিত্তি করে তারা সমাজের একটি অংশের মাঝে স্থায়ী অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে।
তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে,বর্তমান পরিস্থিতিতে কি এ দলগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালনে সক্ষম? জনগণ কি আসলে ইসলামি দলগুলোর প্রতি আস্থা রাখতে প্রস্তুত?
বরিশাল নগরীর কাজিপাড়া এলাকার গার্মেন্টস কর্মী রোকেয়া বেগম বলেন, দুর্নীতি কমানোর কথা ইসলামী দলগুলো বলে। এটা ভালো। কিন্তু তারা কি পুরো দেশ চালাতে পারবে? সেই আত্মবিশ্বাস এখনো পাই না।”
বাকেরগঞ্জের কলেজছাত্র ফয়সাল হোসেন এর মত ভিন্ন, বড় দলগুলোর লড়াইয়ে আমরা বিরক্ত। ইসলামী দলগুলো যদি এক প্ল্যাটফর্মে আসে এবং আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তা দেখায়, তাহলে নতুন প্রজন্ম ভোট দিতে পারে।”
মুলাদির কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী আবদুল মজনু জানান, মাঠে ঘটনাস্থলে প্রথমে সাহায্য নিয়ে আসে ইসলামী সংগঠনের লোকজন। মানুষ এটা দেখে। তাই ভবিষ্যতে ভোট বাড়তে পারে তাদের।”
বরিশাল বিএম কলেজের শিক্ষক রাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সংগঠন শক্তিশালী হলেও প্রশাসন পরিচালনা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আর্থনীতি,এসব জায়গায় ইসলামী দলগুলোর প্রস্তুতি দুর্বল। জনগণ খুব সহজে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কাউকে দিতে চায় না।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামজিদ রশিদ বলেন, ইসলামী দলগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ছে, এটা সত্য। তবে তারা কি জাতীয় রাজনীতির দায়িত্ব নিতে পারবে? সময়ই বলে দেবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দক্ষিণাঞ্চল গবেষক মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ইসলামী দলগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সংগঠন ও গ্রামীণ নেটওয়ার্ক। কিন্তু সবচেয়ে বড় দুর্বলতা—রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা নেই। ভোটব্যাংক গড়ে তুলতে হলে আধুনিক রাজনৈতিক রোডম্যাপ দেখাতে হবে।” তিনি আরও বলেন, বরিশালের মতো অঞ্চলে যেখানে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও ধর্মীয় মানসিকতা বেশি, সেখানে সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলামী দলগুলো দ্রুত জনপ্রিয়তা বাড়াতে পারে। কিন্তু জাতীয় নেতৃত্বের পর্যায়ে যেতে হলে জনগণের বৈচিত্র্যকে ধারণ করার ক্ষমতা দেখাতে হবে।”
মাঠপর্যায়ে তৃণমূল সমর্থক থাকলেও ভোটে তা রূপ নেয় না। আর ধর্মীয় সমাজভিত্তিক প্রচারণায় সক্রিয় করা। এছাড়াও তরুণ ভোটারদের মধ্যে কিছুটা জায়গা তৈরি হচ্ছে ও বড় দলগুলোর ‘বিকল্প শক্তি’ হিসেবে আলোচনায় আসছে। তবে এখনো এককভাবে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন দূরের বিষয়।
বরিশাল অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের সাধারণ অনুভূতি, দুর্নীতি কমানোর জন্য নতুন রাজনৈতিক বিকল্প প্রয়োজন।
আর ইসলামী দলগুলোর স্বচ্ছতা ও আধুনিক নীতিমালা দরকার, বড় দলগুলোর সঙ্গে হতাশা থাকলেও স্থিতিশীল রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা জরুরি। আর তাই জনগণ “পরিবর্তনের আগ্রহ + নিরাপত্তার প্রয়োজন”,এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে।
এদিকে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের জনগণের প্রতিক্রিয়া বলছে, ইসলামী দলগুলো মাঠে সক্রিয়, গ্রহণযোগ্যতাও কিছুটা বাড়ছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ণ বিশ্বাস জনগণের মধ্যে এখনো গড়ে ওঠেনি। বড় দলগুলোর বিকল্প হতে পারলেও, শাসনক্ষমতায় যাওয়ার পথ এখনও দীর্ঘ।
আগামী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তাদের নীতি, ঐক্য, আধুনিক রাজনৈতিক বার্তা এবং জনগণের আস্থাই নির্ধারণ করবে—ইসলামী দলগুলো সত্যিই কি জাতীয় নেতৃত্বে উঠতে পারবে কিনা।