কলমের মর্যাদা আজ কলঙ্কিত। জেলার সুদীর্ঘ সাংবাদিক সম্প্রদায়ের ন্যূনতম সম্মানি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা যেন ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে — আর সেই ফাঁক ভরছে অপসংবাদিকতা। পত্রিকার নাম আর আধারবহির্ভূত “প্রতিনিধি কার্ড”-বাণিজ্য, তরুণ পেশাজীবীদের দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা, এবং মালিক ও সিনিক গোষ্ঠীর শোষণ—এসব মিলিয়ে আজ কর্মজীবী সাংবাদিকরা ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও মানসিক কষ্টে দিনাতিপাত করছে। যদি এমনভাবেই ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে খবরের গল্পই বিকৃত হবে — তবে সাংবাদিকতাই হারাবে তার আত্মপরিচয়।
প্রথম সমস্যা: সম্মান ও রেশ্যের অভাব
পত্রিকার কাগজে কলম ধরার জন্য যে সম্মান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থাকা দরকার, তা নেই। ন্যূনতম সম্মানিকে ব্ল্যাঙ্কচেক করা হচ্ছে না—পরিশ্রমের সঠিক মজুরি, পেনশন, স্বাস্থ্যবীমা কিংবা দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ নেই। ফলে বহু যোগ্য তরুণ এই পেশা ত্যাগ করছে বা অপসংবাদিকতার দিকে ঝুঁকছে।
দ্বিতীয় সমস্যা: কার্ড-বাণিজ্য ও প্রতিনিধি-ব্যবসা
কিছু সংবাদপত্রের মালিকেরা ‘প্রতিনিধি কার্ড’ দিয়ে ব্যবসা করছেন — সার্টিফিকেশনের নামে লোক নিয়োগ করে কোটি-আয়। এসব কার্ডধারীরা প্রায়ই মাঠের কাজ করেন না; তারা খবর বানান বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কৃত্রিম কল্যাণ ছড়ায়। ফলে পেশার ভিত্রুর মানদণ্ড ক্ষণিকেই ভেঙে পড়ে।
তৃতীয় সমস্যা: নেতাদের ভূমিকাহীনতা
সাংবাদিক ইউনিয়ন, প্রেসক্লাব ও রিপোর্টার্স ইউনিটি-র মতো সংগঠনগুলো মাঠের কণ্ঠস্বর থেকে একপ্রকার দূরে থেকে গেলে নেতৃত্বে স্বচ্ছতা ও আদর্শের অভাব দেখা যায়। নেতাদের যদি প্রকৃত সংবাদকর্মী থেকে উঠে আসা না করা হয়, তবে সংগঠনগুলোই পেশার ধাক্কা সামলাতে ব্যর্থ হবে।
সমাধানের প্রস্তাব — বাস্তব, দৃঢ় এবং তাৎপর্যপূর্ণ
১। শক্তশালী আইনি পদক্ষেপ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
পত্রিকা-প্রতিনিধি কার্ড বাণিজ্যের বিরুদ্ধে প্রথমে প্রশাসনকে (জেলা প্রশাসক, উপজেলা প্রশাসন) ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। মালিকরা যারা নিয়মবাহির আচরণ করে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত—এটাই বার্তা দেবে: পেশার মর্যাদা বেচা কেনা চলবে না।
২। সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেসক্লাবের পুনর্গঠন
ইউনিয়ন/প্রেসক্লাবের নেতারা অবশ্যই মাঠ থেকে উঠে আসা, কাজের নীতিবোধে দৃঢ় এবং ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও মনোনয়ন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জনমুখী করতে হবে—যাতে কাগজে-কলমে নয়, কার্যকারিতাই প্রাধান্য পায়। নির্বাহী কমিটি নিয়মিত কর্মী-শুনানী এবং ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট প্রকাশ করবে।
৩। ন্যূনতম সম্মানিসহ সামাজিক সুরক্ষা
জেলা পর্যায়ে সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম সম্মানি নির্দেশিকা প্রণয়ন করা যেতে পারে—মাসিক সম্মান, দুর্ঘটনা বিমা, যেমন-তেমন অনুগতির জন্য ইনক্রিমেন্ট। নন-প্রফিট ও স্বেচ্ছাসেবী ফান্ডের মাধ্যমে জরুরি সহায়তা ব্যবস্থাও তৈরি করা উচিত।
৪। অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং ও নজরদারি
অপসংবাদিকতা মূলত সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়ায়। জেলা প্রশাসন ও পত্রিকা মালিকদের সমন্বয়ে একটি ত্রৈমাসিক মনিটরিং মেকানিজম চালু করা যেতে পারে—যেখানে ভুয়া নিউজ, কার্ড-বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য কেসগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৫। দক্ষতা উন্নয়ন ও যুবসংযোগ
স্থানীয় প্রেসক্লাব ও ইউনিয়নকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মিডিয়া এথিক্স ও অনলাইন যাচাই-কৌশল চালাতে হবে। সফল সিনিয়র সাংবাদিকদের মেন্টরশিপে তরুণদের মাঠের কাজ শেখানো ও পেশাগত ক্যারিয়ার গঠন করা সম্ভব।
৬। সামাজিক সচেতনতা ও পাঠকদায়িত্ব
স্থানীয় নাগরিক ও পাঠকদেরও স্বচ্ছ সংবাদভোগের দাবি জানাতে হবে—পাঠকরা কার্ডধারী “প্রতিনিধির” সংবাদকে সমর্থন না করে, যাচাই করা পত্রিকার প্রতি আকৃষ্ট হবে তখনই মালিকদের ব্যবসা চালানো কঠিন হবে।
এখনই উদ্যোগ :
বরিশালের সাংবাদিকতা বাঁচাতে চাইলে খালি অভিযোগ করে বসে থাকা চলবে না। মালিক, ইউনিয়ন, প্রেসক্লাব, জেলা প্রশাসন—ভাগ করে নয়, সবাইকে একসাথে এগিয়ে এসে আইনি, অর্থনৈতিক ও নৈতিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কলমের ক্ষুধা মেটাতে হলে প্রথমে কলমকে মর্যাদা দিতে হবে; আর সেই কাজে সবার সক্রিয় ভূমিকা এখনই অনিবার্য। পুলিশের মতো প্রশাসনিক শক্তি ও সাংবাদিক সংগঠনের পরিষ্কার নীতিই পারে এই দুর্নীতি ও অপসংবাদিকতার চর্চা থামাতে—নাহলে খবরই ভুলে যাবে সত্যের আসল উদ্দেশ্য।