ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার ৯ নম্বর দপদপিয়া ইউনিয়নের দপদপিয়া মৌজার “পূর্ব চর দপদপিয়া ১২৯ নম্বর” জমির বিএস মাঠ জরিপ ও বিএস রেকর্ড সংক্রান্ত কার্যক্রমে অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আজ রোববার সকাল ১০টায় দপদপিয়া চৌমাথা এলাকায় এ কর্মসূচি পালিত হয়। এতে অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, জমির মালিক ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএস জরিপ কার্যক্রমে দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্মচারী স্বচ্ছতা বজায় না রেখে অনিয়মের মাধ্যমে রেকর্ড প্রস্তুত করছেন। তারা দাবি করেন, প্রকৃত মালিকদের নাম বাদ দিয়ে বা জমির পরিমাণ কম দেখিয়ে অন্যদের নামে রেকর্ড করার চেষ্টা চলছে—এমন আশঙ্কা থেকেই তারা রাস্তায় নেমেছেন। অভিযোগে কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা জানান, পূর্ব চর দপদপিয়া ১২৯ নম্বর জমিটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দাদের দখল ও ভোগদখলে রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী জরিপ করে প্রকৃত মালিকদের নামে রেকর্ড করার কথা থাকলেও মাঠ পর্যায়ে গিয়ে ভিন্ন বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ। তারা বলেন, জরিপ চলাকালে কিছু দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ দাবি করে। অর্থ না দিলে জমির পরিমাপ বা খতিয়ান নথিভুক্তিতে সমস্যা তৈরি করা হবে—এমন কথাও বলা হচ্ছে বলে দাবি করেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রথমে দপদপিয়া চৌমাথা এলাকায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। পরে সেখান থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে আশপাশের সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা বরিশাল–পটুয়াখালী মহাসড়কের একটি অংশে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেন। এতে সড়কের দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয় এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পরে স্থানীয় প্রশাসনের অনুরোধে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
বরিশাল–পটুয়াখালী মহাসড়ক অবরোধের সময় বক্তারা বলেন, “ভূমি সংক্রান্ত রেকর্ড মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এখানে যদি অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়, তাহলে একজন মানুষ তার পৈতৃক সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন। তাই আমরা চাই জরিপ কার্যক্রম হোক সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে।” তারা অভিযোগ করেন, মাঠ পর্যায়ে সঠিক যাচাই-বাছাই না করে তড়িঘড়ি করে কাগজপত্র তৈরি করা হচ্ছে।
মানববন্ধনে এলাকাবাসীর পক্ষে তিনজন বক্তা বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, বিএস জরিপ ও রেকর্ড কার্যক্রম চলাকালে প্রকৃত মালিকদের উপস্থিতি, দলিলপত্র যাচাই, সীমানা নির্ধারণ—সবকিছু নিয়ম মেনে করার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে জমির মালিকদের যথাযথভাবে ডাকা হচ্ছে না বা তাদের কাগজপত্র গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ তোলেন তারা। বক্তারা আরও বলেন, যদি নিরপেক্ষ তদন্ত না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
একজন বক্তা তার বক্তব্যে বলেন, “আমরা কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে অবস্থান নিতে চাই না। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের কার্যক্রম তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করতে হবে। যদি তারা নির্দোষ হন, সেটাও প্রকাশ হোক। আর যদি অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।” তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
আরেকজন বক্তা বলেন, “এসএ ও বিএস রেকর্ড মানুষের জমির মালিকানার মূল ভিত্তি। এখানে যদি ভুল বা কারচুপি হয়, তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই আমরা দাবি জানাই—বর্তমান বিতর্কিত জরিপ কার্যক্রম স্থগিত করে পুনরায় যাচাই-বাছাই করা হোক।” তিনি অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে জমির শ্রেণি পরিবর্তন বা পরিমাণে গরমিল দেখা যাচ্ছে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দপদপিয়া চৌমাথা এলাকার সাধারণ জনগণের ব্যানারে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক ব্যানারে নয়, সম্পূর্ণভাবে জমির স্বার্থ রক্ষার দাবিতে এই কর্মসূচি পালিত হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। তারা বলেন, “আমরা সাধারণ মানুষ। জমিই আমাদের একমাত্র সম্বল। তাই জমির রেকর্ড নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না।”
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া কয়েকজন নারীও তাদের বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বহু বছর ধরে জমি ভোগদখল করে এলেও রেকর্ডে নাম না থাকলে ভবিষ্যতে উত্তরাধিকার নিয়ে জটিলতা তৈরি হবে। এতে সামাজিক ও পারিবারিক বিরোধ বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ওই মৌজায় বিএস মাঠ জরিপ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জরিপ কার্যক্রমকে ঘিরে নানা গুঞ্জন ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়। তবে সংশ্লিষ্ট জরিপ টিম বা ভূমি অফিসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য এখনও পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বক্তব্য মেলেনি। প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
মানববন্ধন শেষে আয়োজকরা ঘোষণা দেন, তাদের দাবির বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ভূমি জরিপ অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এদিকে সড়ক অবরোধের কারণে সৃষ্ট যানজট নিরসনে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তারা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করেন এবং অবরোধ তুলে নিতে অনুরোধ জানান। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় এবং যান চলাচল পুনরায় শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ভূমি জরিপ ও রেকর্ড সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা জরুরি। কারণ জমি সংক্রান্ত বিরোধ দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তাই সব পক্ষের বক্তব্য নিয়ে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সচেতন মহল।