মন্তব্য প্রতিবেদন ; আসাদুজ্জামান মুরাদ
সাংবাদিক বাঁচলে সংবাদ বাঁচবে, সংবাদ বাঁচলে গণমাধ্যম বাঁচবে; আর গণমাধ্যম বাঁচলে শক্তিশালী হবে গণতন্ত্র। এটি কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো, জবাবদিহি ও মানুষের বাক্স্বাধীনতা রক্ষার অন্যতম মৌলিক সত্য।
একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম রাষ্ট্রের দর্পণ। সমাজের অসংগতি, দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরাই সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি সাংবাদিককে হামলা, মামলা, হুমকি, হয়রানি কিংবা পেশাগত বাধার মুখে পড়তে হয়, তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ সংকুচিত হয়ে আসে। আর সাংবাদিকতার কণ্ঠ রুদ্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু গণমাধ্যম নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ ও রাষ্ট্র।
সাংবাদিকতা কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির অনুগ্রহ নয়, এটি জনগণের তথ্য জানার অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পেশাগত স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দুঃখজনক হলেও সত্য, সাংবাদিকদের একাংশ পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন। কোথাও সংবাদ প্রকাশের জেরে হুমকি, কোথাও শারীরিক হামলা, আবার কোথাও মিথ্যা মামলা কিংবা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
তবে সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্র কিংবা প্রশাসনের নয়; সাংবাদিকদের নিজেদেরও পেশাগত সততা, নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও নৈতিকতার প্রতি অবিচল থাকতে হবে। অপসাংবাদিকতা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ, ব্যক্তিস্বার্থে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার এবং যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য প্রকাশের প্রবণতা পরিহার করতে হবে। কারণ, সাংবাদিকতার স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা।
সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য, পেশাগত সংহতি ও সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলাও সময়ের দাবি। ব্যক্তিগত কিংবা সাংগঠনিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু কোনো সাংবাদিক অন্যায়ভাবে আক্রান্ত হলে সত্য উদ্ঘাটন, ন্যায়বিচার ও পেশাগত মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে সম্মিলিত অবস্থান জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার রোধ এবং প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকদের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
গণতন্ত্রের শক্তি শুধু নির্বাচন কিংবা সংসদীয় কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যেও এর প্রকৃত ভিত্তি নিহিত। স্বাধীন গণমাধ্যম এসব বিষয়কে জনসমক্ষে তুলে ধরে এবং ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে সহায়তা করে।
তাই সাংবাদিকের কণ্ঠকে ভয় দেখিয়ে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মানে জনগণের জানার অধিকারকে সংকুচিত করা। সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে সত্য প্রকাশের পথকে সুরক্ষিত করা। আর সত্য প্রকাশের পথ অবারিত রাখা মানে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করা।
মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকের কলম থেমে গেলে অনেক অনিয়ম আড়ালে থেকে যায়, অনেক নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠ অশ্রুত থেকে যায়, অনেক প্রশ্নের উত্তর অধরাই থেকে যায়। তাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ পেশাজীবী গোষ্ঠীর দাবি নয়; এটি একটি সুস্থ, সচেতন ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য শর্ত।
পরিশেষে বলতে চাই, সাংবাদিককে বাঁচতে দিতে হবে, সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে। কারণ, সাংবাদিক বাঁচলে সংবাদ বাঁচবে, সংবাদ বাঁচলে গণমাধ্যম বাঁচবে; আর স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও শক্তিশালী গণমাধ্যমই গণতন্ত্রকে করবে আরও সমৃদ্ধ, কার্যকর ও জনমুখী।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক, সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা অটুট থাকুক, গণমাধ্যম শক্তিশালী হোক, গণতন্ত্রের বিজয় হোক।