বিশেষ প্রতিবেদন | আরিফ রহমান
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। পরিবারের স্বচ্ছলতা থেকে শুরু করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, প্রবাসী কর্মীদের ঘামঝরা উপার্জনের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক গুরুতর আইনি সংকটে পড়লে তাঁর ন্যায্য বিচার, আইনি সহায়তা ও মানবিক মর্যাদা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, এ প্রশ্ন বারবার সামনে আসে।
সম্প্রতি সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরকে কেন্দ্র করে সেই প্রশ্ন আবারও আলোচনায় এসেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে অশালীন কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁদের বিচার করা হয়েছিল।
ঘটনাটি সত্য হলে এবং বাংলাদেশের কনস্যুলার কর্তৃপক্ষকে সত্যিই আগে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত না করা হয়ে থাকলে, বিষয়টি শুধু দুটি প্রাণহানির ঘটনা নয়; বরং বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন, কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব ও প্রচলিত আইনকে সম্মান করা যেমন জরুরি, তেমনি বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৬৩ সালের ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনস-এর ৩৬ অনুচ্ছেদ বিদেশে আটক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর দেশের কনস্যুলার কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ ও সহায়তা পাওয়ার অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান দিয়েছে।
কোনো বিদেশি নাগরিক আটক হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাঁর কনস্যুলার অধিকার সম্পর্কে অবহিত করা এবং তিনি চাইলে তাঁর দেশের কনস্যুলার পোস্টকে জানানোর ব্যবস্থা করার বিষয়টি এই অনুচ্ছেদে অন্তর্ভুক্ত। তবে এই বিধানকে প্রতিটি গ্রেপ্তার বা বিচার সম্পর্কে দূতাবাসকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব পরিস্থিতিতে অবিলম্বে জানানোর নিঃশর্ত বাধ্যবাধকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট আইনি পরিস্থিতি ও কনভেনশনের শর্ত বিবেচনা করতে হয়।
এ কারণে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে জানানো হয়েছিল কি না, তাঁদের কনস্যুলার যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং বিচার চলাকালে তাঁরা কার্যকর আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।
জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেটের বক্তব্য এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, আদালতের রায় ও মামলার নথি যাচাই ছাড়া কোনো পক্ষকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা উচিত নয়।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে শরিয়াহ আইনের ‘তা’জির’ নীতির অধীনে দুই বাংলাদেশিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। তা’জির হলো এমন এক ধরনের শাস্তি, যার ধরন ও মাত্রা নির্ধারণে ইসলামী আইনশাস্ত্রের নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে বিচারিক বিবেচনার ভূমিকা থাকে।
তবে ঠিক কোন আইনি বিধান প্রয়োগ করা হয়েছিল, আদালত কী যুক্তিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন এবং উচ্চ আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে সেই রায় অনুমোদন করেছে, এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কোনো অপরাধের অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার সমাজের রয়েছে। অভিযোগের প্রকৃতি, প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা, অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, আইনজীবীর সহায়তা এবং আপিলের সুযোগ, সবকিছুই পর্যালোচনার বিষয়।
বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে ভুল বিচারের ঝুঁকি এড়ানো, প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং সব ধরনের আইনি প্রতিকার কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে প্রশ্ন তোলা মানে অপরাধকে সমর্থন করা নয়; বরং ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তোলা।
বাংলাদেশের লাখ লাখ প্রবাসী প্রতিনিয়ত কঠোর পরিশ্রম করে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন। তাঁদের উপার্জনে সচল থাকছে অসংখ্য পরিবার, সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি, শক্তিশালী হচ্ছে বৈদেশিক লেনদেনের সক্ষমতা।
কিন্তু একজন প্রবাসী যখন বিদেশের মাটিতে গ্রেপ্তার হন, নির্যাতনের শিকার হন কিংবা গুরুতর কোনো মামলায় অভিযুক্ত হন, তখন তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কতটা রয়েছে?
প্রবাসীদের অবদানকে শুধু রেমিট্যান্সের পরিসংখ্যান দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। তাঁরা প্রত্যেকে একজন নাগরিক, একজন মানুষ এবং কোনো না কোনো পরিবারের নির্ভরতার জায়গা।
তাঁদের আইনি সংকটের সময় প্রয়োজন যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ, নির্ভরযোগ্য অনুবাদ, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কনস্যুলার সহায়তা।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি কিংবা রেমিট্যান্স আহ্বানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সংকটের সময় নাগরিকের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতাও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের প্রভাব, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ অনেক সময় বিদেশে আটক নাগরিকদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রভাবশালী দেশগুলো সাধারণত তাদের নাগরিকদের মামলা পর্যবেক্ষণ, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য সক্রিয় থাকে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তবে বিদেশে কোনো দেশের নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা হলে সেই দেশের সরকার সব সময় বিচার বন্ধ করতে পারে না কিংবা নাগরিককে নিজ দেশে ফিরিয়ে আনতে পারে না। স্বাগতিক দেশের আইন, বিচারিক এখতিয়ার এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির বাধ্যবাধকতা বিবেচনা করেই কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হয়।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলো প্রবাসীদের আইনি সংকটের খবর কত দ্রুত সংগ্রহ করে? মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলাগুলো কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়? কোনো বাংলাদেশি গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হলে তাঁর পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা কতটা রয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আবেগনির্ভর বক্তব্যের পরিবর্তে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং কূটনৈতিক সক্ষমতার উন্নয়ন।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ সৌদি আরবের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেটের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
যদি সত্যিই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে জানানো না হয়ে থাকে, তাহলে কী কারণে এমনটি ঘটেছে, কনস্যুলার অধিকার যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এসব বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।
কেবল ঘটনার পর তথ্য চাওয়া যথেষ্ট নয়। বিদেশে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলাসহ গুরুতর ফৌজদারি মামলাগুলোর জন্য ঝুঁকিভিত্তিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, আইনজীবীদের সঙ্গে সমন্বয়, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং জরুরি কনস্যুলার সহায়তার কাঠামো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সৌদি আরবসহ যেসব দেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন, সেসব দেশের সঙ্গে নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি নারী কর্মীদের নিরাপত্তা, বেতন, কর্মপরিবেশ এবং শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের বিষয়।
কোনো নারী কর্মী নির্যাতনের শিকার হলে তাঁর অভিযোগ গ্রহণ, নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা এবং দেশে ফেরার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও অপরাধ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা জরুরি।
তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার তথ্য ছাড়া সব অভিযোগকে একইভাবে বিবেচনা করা কিংবা কোনো দেশের সব নিয়োগকর্তাকে দায়ী করা সমীচীন নয়। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান, অভিযোগের সঠিক নথিবদ্ধকরণ এবং প্রতিটি ঘটনার ন্যায়সংগত তদন্ত।
প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কর্মী নিয়োগের আগের প্রস্তুতি, চুক্তির স্বচ্ছতা, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিদেশে অবস্থানকালে সহায়তা, সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনি সহায়তা আরও কার্যকর করতে একটি বিশেষায়িত ‘প্রবাসী আইনি সহায়তা ও প্রতিরক্ষা সেল’ গঠনের প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে।
এই সেলের সম্ভাব্য দায়িত্ব হতে পারে,
১. গুরুতর মামলার তালিকা ও পর্যবেক্ষণ: মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলা, দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের ঝুঁকি এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দ্রুত শনাক্ত করা।
২. আইনি সহায়তার সমন্বয়: স্বাগতিক দেশের আইন অনুযায়ী স্থানীয় আইনজীবী, দোভাষী ও প্রয়োজনীয় আইনি পরামর্শের ব্যবস্থা করতে সহায়তা করা।
৩. কনস্যুলার যোগাযোগ: আটক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ, পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছানো এবং প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক বিধান অনুযায়ী কনস্যুলার অধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া।
৪. জরুরি সহায়তা তহবিল: অসচ্ছল প্রবাসীদের গুরুতর আইনি সংকটে সহায়তার জন্য স্বচ্ছ নীতিমালা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে তহবিল গঠন করা।
৫. নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ: বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের গুরুতর আইনি সংকট, সহায়তার ধরন এবং সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপ সম্পর্কে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
এ ধরনের উদ্যোগ প্রবাসীদের সব আইনি সমস্যা সমাধানের নিশ্চয়তা দেবে না। তবে সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এটি সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষা, দেশের আইন মেনে চলা এবং অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা, সবই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্ত হলো অভিযোগের নিরপেক্ষ বিচার, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ।
জাতিসংঘের মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ১০ অনুচ্ছেদে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে ন্যায়সংগত ও প্রকাশ্য শুনানির অধিকার এবং ১১ অনুচ্ছেদে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ বলে গণ্য হওয়ার নীতি তুলে ধরা হয়েছে। এসব নীতির আলোকে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে আলোচনা করা জরুরি।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদও আইনের আশ্রয় ও আইনানুযায়ী আচরণ লাভের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। তবে বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকের ক্ষেত্রে এই সাংবিধানিক বিধানের প্রয়োগ এবং সরকারের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দেশের সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা, প্রবাসীদের শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়, পূর্ণ মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হবে। বিদেশে তাঁরা আইনি সংকটে পড়লে সরকার যথাসাধ্য ও আইনসম্মতভাবে পাশে দাঁড়াবে।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য যদি সঠিক হয়, তবে এর প্রতিটি আইনি ও কূটনৈতিক দিক স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং বাংলাদেশের কাছে তথ্য পৌঁছানোর বিষয়গুলো নির্ভরযোগ্য সূত্রে যাচাই করে সরকারকে স্পষ্ট অবস্থান জানাতে হবে।
এ দাবি কোনো অপরাধকে আড়াল করার জন্য নয়; বরং ন্যায়বিচার, আইনের শাসন এবং মানবিক মর্যাদার পক্ষে।
বাংলাদেশের প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। কিন্তু তাঁদের অধিকারের ভিত্তি কেবল অর্থনৈতিক অবদান নয়, তাঁরা মানুষ, তাঁরা নাগরিক। তাঁদের নিরাপত্তা, ন্যায্য বিচার ও মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
প্রবাসীদের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে; আর তাঁদের অধিকার রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতাকে শক্তিশালী করে। বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি যেন আইনি সহায়তা ও মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত না হন, এটাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক অঙ্গীকার।
লেখক: আরিফ রহমান
গবেষক ও বিশ্লেষক
আজীবন সদস্য, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট
যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম
আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি