1. admin@dailybarishalmukhopatro.com : admin-barishal :
  2. adminaminalamin@gmail.com : দৈনিক বরিশাল মুখপত্র : দৈনিক বরিশাল মুখপত্র
শিরোনামঃ
মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: আবেগের আড়ালে সত্য, গুজবের বিরুদ্ধে সাংবাদিকতার লড়াই সাংবাদিক বাঁচলে সংবাদ বাঁচবে, সংবাদ বাঁচলে গণতন্ত্র বাঁচবে ; সাংবাদিকের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্রের ভিত্তিই হয়ে উঠবে দুর্বল ! অনিয়ম দুর্নীতিতে জর্জরিত বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশলঃ দুদকে অভিযোগ শুধু রেমিট্যান্সের মেশিন, নাকি মানুষ? সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড ঘিরে কূটনৈতিক প্রশ্ন আন্তর্জাতিক আইন, কনস্যুলার সুরক্ষা ও প্রবাসীদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনার দাবি কলাপাড়ায় নিখোঁজ শিশু রাইয়ান (১০) এর মৃতদেহ উদ্ধার। নেতাকর্মী নয়, জনসম্পৃক্ত আন্দোলনই ক্ষমতার চাবিকাঠি: বাংলাদেশি রাজনীতির নতুন পাঠ লটারির আড়ালে ‘বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ; জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের পদায়নে ক্ষোভ বরিশালে বিশ্ব এনেস্থেসিয়া দিবস পালিত এনেস্থেসিওলজিস্টদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান বরিশাল চরকাউয়ায় মসজিদ-মন্দিরের নানা অব্যবস্থাপনা, দ্রুত সমাধান জরুরী নেত্রকোনায় সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা; বিএমএসএফের প্রতিবাদ

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: আবেগের আড়ালে সত্য, গুজবের বিরুদ্ধে সাংবাদিকতার লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক✍️
  • প্রকাশিত সময় সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৬ বার পড়েছেন

মন্তব্য কলাম | যাচাইহীন গল্প নয়, সত্য ও তথ্যের ভিত্তিতেই হোক জনমত গঠন

লেখক: আরিফ রহমান

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কিন্তু এই মাধ্যমেই যখন সত্যের পাশাপাশি মিথ্যা, অর্ধসত্য, মনগড়া কাহিনি ও আবেগনির্ভর প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রকৃত ঘটনা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ধর্ম, মানবিক আবেগ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কিংবা মৃত্যুদণ্ডের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে কেন্দ্র করে গুজব ছড়ালে তার প্রভাব ব্যক্তিগত পর্যায় ছাড়িয়ে জাতীয় জনমতেও পড়তে পারে।

সম্প্রতি সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা তেমনই একটি আলোচিত বিষয়। গত ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে সৌদি কর্তৃপক্ষের ঘোষণায় নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য প্রকাশিত হয়। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের পরিচয়, অপরাধের প্রকৃতি, গ্রেপ্তারের কারণ এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নানা আবেগঘন গল্প ছড়িয়ে পড়ে।

কোথাও দাবি করা হয়েছে, তাঁরা স্বামী-স্ত্রী ছিলেন এবং পবিত্র মসজিদে স্ত্রীর কপালে চুম্বন করার কারণে মৃত্যুদণ্ডের শিকার হয়েছেন। কোথাও আবার একজন পাকিস্তানি নাগরিকের ভিডিও ধারণ, ভাষাগত বিভ্রান্তি ও কথিত ষড়যন্ত্রের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ কোথায়?

একটি ঘটনা মর্মান্তিক হলেই তাকে কেন্দ্র করে প্রচারিত প্রতিটি গল্প সত্য হয়ে যায় না। আবার সরকারি বিবৃতিতে অপরাধের বিস্তারিত প্রকাশ না পেলেও সেই শূন্যস্থান মনগড়া কাহিনি দিয়ে পূরণ করা যায় না। অতএব, আবেগের পরিবর্তে তথ্য, অনুমানের পরিবর্তে প্রমাণ এবং প্রচারণার পরিবর্তে বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধানই হওয়া উচিত আমাদের আলোচনার ভিত্তি।

সরকারি বিবৃতিতে কী বলা হয়েছে?

সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি সৌদি প্রেস এজেন্সির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমও ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

দ্য ডেইলি স্টার ১৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের আটক করে, তদন্তের পর অভিযোগ আনা হয় এবং সংশ্লিষ্ট আদালত তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরবর্তী বিচারিক অনুমোদন ও রাজকীয় আদেশের পর সাজা কার্যকর করা হয়।

প্রতিবেদনটির সূত্র: The Daily Star, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, “KSA executes 2 Bangladeshis for ‘immoral act’”।

সৌদি কর্তৃপক্ষের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অপরাধের গুরুত্ব এবং অপরাধ সংঘটনের সময় ও স্থানের পবিত্রতা লঙ্ঘনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাআজিরের আওতায় সাজা দেওয়া হয়। তাআজির হলো ইসলামী আইনব্যবস্থায় নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারকের বিবেচনাধীন শাস্তির একটি শ্রেণি।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। সৌদি কর্তৃপক্ষ অপরাধকে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করলেও প্রকাশিত বিবৃতিতে ঠিক কী ঘটেছিল, কোন মসজিদে ঘটনাটি ঘটেছিল কিংবা অপরাধের বিস্তারিত পরিস্থিতি কী ছিল, তা স্পষ্ট করেনি।

অর্থাৎ, সরকারি বিবৃতিতে যতটুকু তথ্য রয়েছে, ততটুকুই নিশ্চিতভাবে বলা যায়; এর বাইরে কোনো ব্যাখ্যাকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ নেই।

স্বামী-স্ত্রীর কপালে চুম্বনের গল্প: প্রমাণ কোথায়?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সবচেয়ে আবেগঘন দাবিগুলোর একটি হলো, ওমরাহ করতে যাওয়া এক দম্পতি মসজিদের ভেতরে আবেগবশত পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেছিলেন এবং সেই কারণেই তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

গল্পটি মানুষের আবেগকে স্পর্শ করতে পারে। কেউ হয়তো এতে মানবিক নিষ্ঠুরতার চিত্র দেখছেন, কেউ আবার বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশিদের অসহায়ত্বের কথা ভাবছেন। কিন্তু কোনো গল্প মানুষের আবেগকে নাড়া দিতে পারলেই তা ঐতিহাসিক বা আইনি সত্য হয়ে যায় না।

সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিতে ওই দুই ব্যক্তি পরস্পরের স্বামী-স্ত্রী ছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। তাঁদের একজনের কপালে অন্যজন চুম্বন করেছিলেন, এমন তথ্যও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি।

তাহলে এই গল্পের উৎস কী? কে প্রথম এটি প্রচার করেছেন? এর পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর যাচাইযোগ্য বক্তব্য, আদালতের নথি কিংবা নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্র রয়েছে কি?

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ঘটনাটিকে ‘শুধু কপালে চুম্বনের কারণে মৃত্যুদণ্ড’ বলে প্রচার করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নয়।

একইভাবে, অপরাধের প্রকৃতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশিত না হওয়ায় অনুমাননির্ভর কোনো ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত সত্য বলাও সমীচীন হবে না।

সত্য অনুসন্ধানের অর্থ কোনো পক্ষকে অন্ধভাবে সমর্থন করা নয়; বরং প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিটি দাবিকে যাচাই করা।

পাকিস্তানি নাগরিকের ষড়যন্ত্র: তথ্য, নাকি আবেগনির্ভর কল্পকাহিনি?

ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও একটি গল্প প্রচারিত হয়েছে। সেখানে দাবি করা হচ্ছে, একজন পাকিস্তানি নাগরিক ভিডিও ধারণ করেছিলেন, পরে তিনি সাক্ষী বা দোভাষীর ভূমিকা পালন করেন এবং ভাষাগত বিভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশি দুই নাগরিককে ফাঁসানো হয়।

এ ধরনের দাবি অত্যন্ত গুরুতর। কারণ, এতে একটি নির্দিষ্ট দেশের নাগরিককে ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে এবং একটি দেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুতর অভিযোগ তোলা হচ্ছে।

কিন্তু অভিযোগ যত গুরুতর, তার পক্ষে প্রমাণের প্রয়োজনও তত বেশি।

সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতি এবং ঘটনাটি নিয়ে দ্য ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ২৪ডটকম ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে পাকিস্তানি নাগরিকের কথিত ষড়যন্ত্র, ভিডিও ধারণ কিংবা দোভাষী হিসেবে তাঁর ভূমিকার কোনো সমর্থন পাওয়া যায় না।

এ থেকে সতর্কভাবে বলা যায়, পাকিস্তানি নাগরিকের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত গল্পটির পক্ষে এখন পর্যন্ত উল্লেখিত নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোতে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবে এর অর্থ এই নয় যে মামলার প্রতিটি অপ্রকাশিত বিষয় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছি। বরং প্রকৃত সত্য জানতে প্রয়োজন মামলার নথি, সাক্ষ্যপ্রমাণ, বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য।

আইনি প্রক্রিয়ায় দোভাষী নিয়োগ, আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কিংবা বিচারিক পর্যালোচনা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু এই নির্দিষ্ট মামলায় কী ঘটেছে, তার প্রমাণ ছাড়া কোনো প্রক্রিয়াকে নিশ্চিতভাবে অনুসৃত হয়েছে বলে দাবি করা ঠিক নয়।

একইভাবে, কোনো তৃতীয় পক্ষের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তাঁকে দায়ী করাও ন্যায়সংগত নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: বাংলাদেশ সরকারকে আগে জানানো হয়নি কেন?

এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান।

সৌদি কর্তৃপক্ষের ঘোষণার পর বাংলাদেশের কনস্যুলেট ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানতে চাওয়া হয়। বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের এ বিষয়ে অবহিত করা হয়নি।

১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, বিএসএস প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করে এবং ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা চায়।

সূত্র:

  • BSS, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, “Dhaka seeks explanation over two Bangladeshis’ executions”।
  • The Daily Star, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, “Execution of 2 Bangladeshis in Makkah: Dhaka seeks explanation from Saudi ambassador”।

এখানে বাংলাদেশের প্রধান উদ্বেগ শুধু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা নয়; বরং সংশ্লিষ্ট নাগরিকদের পরিচয়, অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং কূটনৈতিক মিশনকে আগে অবহিত না করার কারণও।

বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। তাঁদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

অন্যদিকে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য না জেনে আগাম সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও উচিত নয়।

সুতরাং, এ মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন আবেগনির্ভর বিতর্ক নয়; বরং দুই দেশের মধ্যে কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ, পূর্ণাঙ্গ তথ্য বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা।

সত্য বনাম গুজব: একনজরে যা জানা জরুরি

১. মৃত্যুদণ্ড কার্যকর: সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

২. অপরাধের প্রকৃতি: সৌদি কর্তৃপক্ষ অপরাধটিকে মসজিদের ভেতরে সংঘটিত ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে প্রকাশিত বিবৃতিতে ঘটনার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

৩. বৈবাহিক সম্পর্ক: তাঁরা স্বামী-স্ত্রী ছিলেন কি না, তা প্রকাশিত সরকারি বিবৃতি থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

৪. কপালে চুম্বনের দাবি: শুধু কপালে চুম্বনের কারণে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, এমন দাবির পক্ষে উল্লেখিত সরকারি বিবৃতি বা নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্রে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

৫. পাকিস্তানি নাগরিকের ষড়যন্ত্র: কথিত ভিডিও ধারণ, দোভাষী হিসেবে ভূমিকা কিংবা ষড়যন্ত্রের দাবির পক্ষে উল্লেখিত নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোতে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

৬. বিচারপ্রক্রিয়া: সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্ত, আদালতের রায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও রাজকীয় আদেশের পর সাজা কার্যকর হয়েছে। তবে মামলার পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশিত না হওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়ার সব খুঁটিনাটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

৭. বাংলাদেশের অবস্থান: বাংলাদেশ সরকার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও ব্যাখ্যা চেয়েছে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন আগে অবহিত না হওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগের সঙ্গে তুলে ধরেছে।

এই তথ্যগুলো থেকে স্পষ্ট, ঘটনার কিছু মৌলিক বিষয় নিশ্চিত হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অনেক নাটকীয় দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

সাংবাদিকতার দায়িত্ব: ভাইরাল হওয়া নয়, সত্য প্রকাশ করা

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো একটি পোস্ট ভাইরাল হলেই অনেকে সেটিকে সত্য বলে ধরে নেন। আবেগঘন ছবি, নাটকীয় সংলাপ, কথিত প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য কিংবা বিদেশি ষড়যন্ত্রের গল্প মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

কিন্তু একটি মিথ্যা তথ্য যখন লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, তখন সেটি শুধু একজন পাঠককে বিভ্রান্ত করে না; বরং ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে সাংবাদিকদের দায়িত্ব এখানে আরও বেশি। সাংবাদিকতা কেবল তথ্য প্রচারের নাম নয়; তথ্যের সত্যতা যাচাই, বক্তব্যের উৎস শনাক্ত করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সংবাদ পরিবেশন করাও এর অপরিহার্য অংশ।

কোনো সংবাদে আবেগ থাকতে পারে, মানবিক আবেদন থাকতে পারে, কঠিন প্রশ্নও থাকতে পারে। কিন্তু তথ্যের জায়গায় কল্পনা বসানো যাবে না।

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবশ্যই যৌক্তিক। তাঁদের আইনি অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত হয়েছিল কি না, বাংলাদেশকে আগে অবহিত করা হয়নি কেন, কনস্যুলার সহায়তার সুযোগ কতটা ছিল এবং মামলার প্রকৃত বিবরণ কী, এসব প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন।

কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রমাণহীন কোনো গল্পকে সত্য হিসেবে প্রচার করা হলে প্রকৃত অনুসন্ধানই বাধাগ্রস্ত হবে।

উপসংহার: গুজব নয়, প্রমাণই হোক জনমতের ভিত্তি

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা নিঃসন্দেহে গভীরভাবে সংবেদনশীল। এ ঘটনায় মানবিক উদ্বেগ, আইনি প্রশ্ন এবং কূটনৈতিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রতিটি দাবিকে যাচাই করারও প্রয়োজন রয়েছে।

মনে রাখতে হবে, সত্য সব সময় আবেগঘন গল্পের মতো আকর্ষণীয় হয় না। অনেক সময় সত্যের সন্ধান পেতে প্রয়োজন ধৈর্য, নথি পর্যালোচনা, নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের সমর্থন।

একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব হলো যাচাইহীন তথ্য শেয়ার না করা। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা। আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো তার নাগরিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা।

গুজবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র উচ্চকণ্ঠ প্রচারণা নয়, যাচাই করা তথ্য, নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা।

সত্য অনুসন্ধানের স্বার্থেই আমাদের প্রশ্ন করতে হবে, তথ্য যাচাই করতে হবে এবং অপ্রমাণিত দাবিকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

কারণ, একটি সমাজে গুজব যত দ্রুত ছড়ায়, সত্য প্রতিষ্ঠা করতে তত বেশি দায়িত্বশীলতার প্রয়োজন হয়।

লেখক পরিচিতি

আরিফ রহমান
লেখক ও গবেষক; আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি; আজীবন সদস্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট; যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম, কেন্দ্রীয় কমিটি।

ফটোকার্ড বানান

নিউজটি ফেসবুকে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর

[ramadan_somoysuci]

© All rights reserved © 2025 dailybarishalmukhopatro.com